প্রায় এক বছর আগের ঘটনা। ২২ শে ফেব্রুয়ারির দিন। শনিবার। বাংলাদেশীরা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পালন করবে বলে একটা সভাগৃহ ভাড়া নিয়েছে হেলসিংকি শহরে। ভাষা দিবস একদিন পরে উদযাপিত হচ্ছে কারণ আগেরদিন ছুটি ছিল না। সবাই আমন্ত্রিত— যেকোন দেশের বা ভাষাভাষীর মানুষ আসতে পারে। উদযাপন শুরু হল একটি সমবেত সংগীতের মাধ্যমে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি।' এরপর একে একে নাটক, আবৃত্তি, গান ও ধারাবিবরণীর মাধ্যমে ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হল:
১৯৪৭ সাল। স্বাধীনতার সাথে সাথে দেশ ভাগও হয়েছে। বা বলা ভাল বাংলা আর পাঞ্জাব ভাগ হয়েছে। তখনও বাংলাদেশ সৃষ্টি হয় নি, অধুনা বাংলাদেশ তখনও পাকিস্তানের অন্তর্গত, পূর্ব বাংলা (পরে ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান) নামে পরিচিত। সেখানে থাকে মূলত বাংলাভাষীরা। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানেও কর্ম ও পড়াশুনা সূত্রে থাকে অনেক বাংলাভাষী। সব মিলে, পাকিস্তানে, বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবু জোর করে উর্দু কে চাপিয়ে দেওয়া হল একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে। বাংলাভাষীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন। ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তান গণপরিষদের (কনষ্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম সরকারি ভাবে, পাকিস্তান গণপরিষদে, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার করা প্রস্তাব দিলেন। পাকিস্তানের শাসককুল সে সবে কান দিলেন না।
এখানে বলে রাখা ভাল যে, তদানীন্তন পাকিস্তানে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, সরকারি ও সামরিক ক্ষমতার বেশিরভাগটাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। আরো বিশেষ ভাবে বললে পাঞ্জাবিদের হাতে। এছাড়া কিছু সিন্ধি পরিবারও ছিল প্রভাবশালী, যেমন ভুট্টো পরিবার। তা সে যাই হোক, বাংলাভাষীদের ভাষা আন্দোলন চলতেই থাকল। ১৯৫২ র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, আপাময় জনসাধারণকে সাথে নিয়ে, বিরাট আন্দোলন গড়ে তুললেন। পুলিশের গুলি চলল। পাঁচজন শহীদ হলেন। শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হলেন। রক্তে রঞ্জিত হল ২১শে ফেব্রুয়ারি। সময় যত এগোতে লাগল — চারের দশক পার হয়ে পাঁচের দশক, এরপর ছয়ের দশক — পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ঘটনাবলী প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিতে লাগল, পাকিস্তানের ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী যে কেবলমাত্র বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী তা নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ঘোরতর বাঙালি বিদ্বেষী। ১৯৬৫ সালে, সামরিক স্বৈরশাসক আয়ূব খানের আমলে, রবীন্দ্রসংগীত ব্যান করা হল। বিশিষ্ট পাকিস্তানি সাংবাদিক হাসান নিশার বলেছেন, বাঙালি বিদ্বেষ প্রায়শই বর্ণ বিদ্বেষের চেহারা নিত। স্মৃতি চারণা করতে গিয়ে উনি বলেন 'যখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে অনেকে পড়তে আসত। ওদের আলাদা কোটা ছিল। আমরা ওদের বিদ্রুপ করতাম। ওরা ছিল আমাদের থেকে কালো। শারীরিক শক্তিও কম। ওরা হোস্টেলে লুঙ্গী পরে থাকত। ওদের সবকিছু আমাদের জোকারের মত লাগত। কিছুদিনের মধ্যে, ওদেরকে আমরা প্রায় ক্রীতদাস বানিয়ে ফেলেছিলাম। আমাদের বয়স কম ছিল। আমাদের সু শিক্ষা দেবার কেউ ছিল না।'
এরপর এল মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৭০ সাল। জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়জয়কার হলো। আওয়ামী লীগ মূলত বাংলাভাষীদের দল। নেতৃত্বে শেখ মুজিবর রহমান। কিন্তু চূড়ান্ত বাঙালিবিদ্বেষী সামরিক নেতৃত্ব সাথে দ্বিতীয় বৃহত্তর পার্টি পিপিপি র নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো (ইনিও বাঙালি বিদ্বেষী ) র দালালি— এই দুইয়ে মিলে মুজিবকে বঞ্চিত করা হলো তার নেহ্য প্রাপ্য প্রধানমন্ত্রীর কুরসী থেকে। এরপর মুজিবের নেতৃত্বে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, শুরু হলো বাংলাভাষীদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। আর পূর্ব পাকিস্তান নয়, এবার পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে এক নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন। বাংলাভাষীদের নিজস্ব দেশ— বাংলাদেশ, যার রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, শুধু বাংলা। বিদ্রোহের নেতৃত্বে শেখ মুজিব। বাংলাভাষী মানুষ তাকে ভালোবেসে নাম দিলেন 'বঙ্গবন্ধু।'
চমকে উঠল স্বৈরাচারী শাসককূল। তারা প্রমাদ গুনলো। পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হলে মহাবিপদ। সুজলা সুফলা বঙ্গভূমিকে শোষণ করে এতদিন নিজেদের ভাঁড়ার পূর্ণ করেছে শাসককুল। এছাড়া পদপৃষ্ট করার জন্য একদল ছিল এতদিন। তাদের প্রতি মুহূর্তে অপমানিত ও লাঞ্চিত করে নিজেদের বড় ভাবার যে আমোদ পাওয়া যেত, আর তা পাওয়া যাবে না যদি একবার বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।
বিদ্রোহ দমনে উঠেপড়ে লাগল সেনাবাহিনী। শুরু হল নির্মমতা। বর্বরতা। লক্ষাধিক বাংলাভাষী মানুষকে হত্যা করা হল। লক্ষাধিক নারী শিকার হল ধর্ষণ ও যৌন লাঞ্ছনার। সব জায়গাতেই কিছু ঘরের শত্রূ বিভীষণ, মীরজাফর থাকে। এখানেও তার অন্যথা হল না। অনেক বাংলাভাষী মানুষই সেনাবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে এই আত্মনিধনযজ্ঞে সামিল হলো— এই বেইমানেরাই পরবর্তীতে 'রাজাকার' নামে পরিচিত।
বাংলাভাষী মানুষেরা তাদের যা কিছু সম্বল তাই দিয়েই লড়াইয়ে সামিল হলো— এ লড়াই যা 'মুক্তি যুদ্ধ' নামে পরিচিত। গঠিত হল মুজিব বাহিনী। ভারতবর্ষও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। অবশেষে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লক্ষাধিক বাংলাভাষী নরনারীর প্রাণের বিনিময়ে তৈরী হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। ভাষার লড়াই দিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই স্ফুলিঙ্গ কালক্রমে, রাজনৈতিক চড়াই ও উৎরাই এর মধ্যে দিয়ে দাবানলে পরিণত হয়েছিল, যার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে দিয়ে। তাই অনেকের কাছে ২১শে ফেব্রুয়ারি আর মুক্তিযুদ্ধ সমার্থক।
১৯৭১ সালে, বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে, বাংলা ভাষার নতুন প্রাণ এল। একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। শুধু বাংলা। এরপর, ঘটনায় দুর্ঘটনায় আরো দু দশক পেরোলো স্বাধীন বাংলাদেশের। অনেক ভালোমন্দের সাক্ষী হয়ে রইলো তরুণ এই দেশ। বাংলাদেশের মানুষ চাইলেন তাদের ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস গোটা পৃথিবী জানুক। শেখ হাসিনার প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে বাংলাদেশের সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হলো বিস্তারিত ভাবে। এরপর প্রস্তাব পাশ করা হলো জাতীয় সংঘে। অবশেষে, ১৯৯৯ সালে, জাতীয় সংঘের সাংস্কৃতিক বিভাগ (UNESCO), ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ঘোষণা করলো।
বাংলাদেশের মানুষের প্রদর্শিত নাটকে, গানে, কবিতায় আর বিবরণীতে চোখের সামনে বাঙালি জীবনের আর এক ইতিহাস মূর্ত হয়ে উঠল। এভাবে তো আগে কখনো ভাবিনি। আমরাও বাঙালি, ওরাও বাঙালি। পশ্চিমবঙ্গবাসী অনেক বাঙালি হেলসিংকি শহরে থাকে। আমাদের দুর্গা পূজো, সরস্বতী পূজো, রবীন্দ্র জয়ন্তী, পয়লা বৈশাখ — সব উদযাপিত হয়। কিন্তু কই আমরা তো ২১শে ফেব্রুয়ারি সে ভাবে উদযাপন করি না! অনুষ্ঠান প্রায় শেষের মুখে এসে গিয়েছিল। আর একটি গান হয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে। আমার পাশে অৰ্জুন বসে ছিল। পুরো নাম: মোহাম্মদ ইসমাইল অর্জুন। বরিশালের ছেলে। বয়সে আমার থেকে বছর খানেক ছোট। ওকে আমার অনুভূতির কথা বললাম। ও বললো 'দ্যাখেন দাদা। আপনারা বাংলা ভাষা এমনি পেয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে।'
অনুষ্ঠানের শেষ নিবেদন ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। একটি সমবেত গান: আমি বাংলায় গান গাই। অর্জুন বললো 'এটা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গান নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় দু দশক পরে লেখা গান। তবে এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গান।'
Comments
Post a Comment