কানপুর আই-আই-টিঃ একটি অনির্ভুল আতেঁলনামা




৬০ এর দশকের কোন এক সময়ের ছবি







কানপুর আই-আই-টিঃ একটি অনির্ভুল আতেঁলনামা   
 


ভূমিকা

এই লেখাটা বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয়দের জন্য। এর সাথে অবশ্য বয়সের সম্বন্ধ নেই। তবে আপনার যদি বাজারে ইন্টেলেকচুয়াল বলে সু(কু?)খ্যাতি থাকে তাহলে এই লেখা আপনার জন্য নয়। এটাতে আমাদের কথা লেখা আছে। এটা খুব সিরিয়াস সামাজিক মূল্যায়নের তাগিদে লেখা তা নয়। এই লেখার মধ্যে রাজনৈতিক শুদ্ধিতা  নিয়ে তাই বিশেষ মাথা ঘামাইনি।

এবার আসুন, আস্তে আস্তে গল্প বলা শুরু করি। আই-আই-টিতে বি-টেক পড়ান হয়। বি-টেকের ছেলেমেয়েরা খুব ভাল হয়। বি-টেকে চান্স পাবার জন্য খুব বুদ্ধিমান হতে হয়। বি-টেকিরা অধিকাংশই ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু এরা কমার্সেও খুব ভাল। তাই ডিগ্রি প্রাপ্ত হলেই এরা অনেকে পেপসি বা কোকাকোলা বেচতে আমেরিকা পাড়ি দেয়। কেউ কেউ ব্যাংকে পয়সা গোনার কাজ করে। 

এছাড়া এখানে এম-এস-সি পড়ান হয়। এম-টেক বলেও একটা অদ্ভূদ জিনিস পড়ান হয়। এম-টেকের ছেলেমেয়েরাও খুব ভাল হয়। এরা মাত্র এক বছরে থিসিস বলে একটা মারাত্মক জিনিস তৈরী করে, যার কথা গোপন থাকাই বাঞ্ছনীয়। 

     এতক্ষন যাদের কথা বললাম তারা দ্বিধাহীন ভাবে মনুষ্য প্রজাতির অঙ্গ। এবার আসুন একটা কথা বলি, যা বাইরের প্রায় অনেকেই জানে না। আই-আই-টি তে পি-এইচ-ডি বলেও একটা জিনিস হয়। পি-এইচ-ডি একটি ডিগ্রীর নাম। অনেকটা বি-টেক বা এম-টেকের মত। এক ধরণের স্তন্যপায়ী জীবেদেরই এটা পড়ান বা করান হয়। এই স্তন্যপায়ী জীবেরা দেখতে মানুষেরই মতন। এরা দুপায়ে হাঁটে এবং এদের পিছনে কোন লেজ নেই। কেউ কেউ বলে ‘ছিল’, কিন্তু প্রায় ২৫ বছরের বিবর্তনের ফলে খসে গেছে। এরা মানুষেরই মত কথা বলে। সাধারণত কোন একটা দেশী ভাষাতেই স্বাচ্ছন্দ্য। কেউ কেউ কাটা কাটা ইরাজীও বলে। এরা মানুষ কিনা তাই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। যেমন বাইরের লোকেরা, মানে আই-আই-টির বাইরের মানুষ যারা, তারা কোন ভাবেই মানে না যে এরা মানুষ। তবে এ ব্যাপারে আই-আই-টির সংশ্লিষ্ট অথোরিটি বেশ সংবেদনশীল। যখন এই পি- এইচ-ডি প্রজাতির প্রাণীদের জাতি-পরিচয় বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তখন বাইরের সমস্ত প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে, বহু লোকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, আই- আই-টির এক জাঁহাপনা, রীতিমত ফতোয়া জারি করে এদেরকে “তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ” হিসাবে গ্রহণ করেন। তাই এই পি-এইচ-ডি প্রজাতির প্রাণীদের এখন থেকে আমরা মানুষ হিসাবেই সম্বোধন করব। 
       
     আমি এই পি-এইচ-ডি প্রজাতিরই এক জীব এবং মাইরি বলছি আমার পিছনে ল্যাজ বা মাথায় শিং কিছুই নেই। আমি নিজেকে মানুষ বলেই দাবী করি। আই-আই-টি কানপুরে প্রায় বছর ছয়েক থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। এখানে যা লেখা হয়েছে তার অধিকাংশটাই ওখানে থাকার সময় লেখা। বিশেষ করে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের জুলাই অবধি। তাই রচনাটি অধিকাংশই “বর্তমান কালে” লেখা।


চেনা মুখ
 
              
   রচনাটি ইষ বিক্ষিপ্ত। এখানে এমন অনেক ছবি আছে যার বর্ণনা মূল লেখায় নেই।  আগেই বলেছি, এটা কোনো সামাজিক তাগিদে লেখা তা নয়। এটা কোনো বৈপ্লবিক লেখা তাও নয়। এক নন-ইন্টেলেকচুয়ালের চোখে দেখা, এক বিরাট ইন্টেলেকচুয়াল জগতের, গুরুত্বহীন কিছু জিনিসের সাদামাঠা বর্ণনা। কাউকে আঘাত বা অপমান করাও এর উদ্দেশ্য নয়। তাই হাল্কাচ্ছলে নেবেন।



অভিষেক

সাত বছর আগে (২০০৫ সালে), অতি-রৌদ্রকরোজ্জ্বল মে মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে, একদিন তুফান এক্সপ্রেসে চেপে হাজির হয়েছিলাম এই ক্যাম্পাসে, পি-এইচ-ডির ইন্টারভিউ দিতে। নামের সাথে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ ট্রেন ভূভারতে আর আছে বলে মনে হয় না। আই-আই-টি বম্বের গাছ-গাছালি, হ্রদ, চিতা বাঘে ভরা ক্যাম্পাসে দুবছর কাটাবার পর, এই ক্যাম্পাসের সাথে মে মাসের “রোমান্টিক্‌” দুপুরে যখন প্রথম প্রেমালাপ হয়, তখন মনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল আর মনে নেই। হন্যে হয়ে একটা পি-এইচ-ডির র সুযোগ খুঁজছি তখন। তাই মনে হয়, স্থান মাহাত্ম্য বিচার করার মত মানসিক অবস্থা ছিল না। হল-১ এ এক বা দু রাত ছিলাম। আমের রসের স্বাদ আর ভোর রাতে ডাকা ময়ূরের “মধুর” কণ্ঠস্বরের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আরো একটা সম্পদ: টাইফয়েডের জীবাণু, যা না হলে আজ আর হয়তো এখানে আসা হত না! 


ময়ূর বাহার



প্রায় তিন মাস রোগেভুগে, হাড় সর্বস্ব (আংশিক করিনা কপূরের মত) শরীর নিয়ে ফিরে এলাম এই ক্যাম্পাসে আবার, ছাত্র অবস্থার দ্বিতীয় ধাপে। সেই সময় দেশে আর্থিক বৃদ্ধির হার তরতর করে উঠছে। সফট্‌ওয়ার কোম্পানীগুলোতে চাকরীর ছড়াছড়ি (ইণ্ডিয়া সাইনিং)। মাইনেও আকাশ ছোঁয়া। আমার বন্ধুদের মধ্যে অবশ্য অধিকংশই গবেষণায় আগ্রহী ছিল। অনেকেই আমেরিকা পাড়ি দিল। কেউ উন্নততর গবেষণার আশায় আবার কেউ বা ডলারকে ভাল বেশে। হিংসুটেরা বলে, দ্বিতীয়টাই বেশী সত্যি। সুযোগ বা সাহসের অভাবে আমাদের মত যাদের জাতীয়তাবাদী হতে হল, কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কারের অনেক আগেই আবিষ্কার করলাম যে, অর্থনৈতিক শ্রেণী বিন্যাসে, সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণীকে প্রতিনিধিত্ব করতেও হিমসিম খেতে হবে মাসে মাত্র আট হাজার টাকা স্কলারশিপ্ নিয়ে। তারপর দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত পথ চলা। তথাকথিত এই বিশ্বায়নের যুগে যে কোনো কাজের শেষ মূল্যায়ন যেখানে টাকা, সেখানে চার পাশের মানুষকে কাজের উদ্দেশ্য বোঝাতেই অনেক গলদঘর্ম হতে হত এবং সবশেষে মনে হত এত ঘাম ঝরিয়েও কাজের উদ্দেশ্য বোঝান গেল না, স্রেফ পয়সার হিসাবটা মিলল না বলে। গবেষণা করি শুনে অনেকেই ভাবত নিউটন বা আইনস্টাইনের কথা। সুতরাং মহাকর্ষ বা আপেক্ষিকতাবাদ আবার নতুন করে কোন্‌ সালের কোন্‌ তারিখে আবিষ্কার করতে চলেছি জিজ্ঞাসা করত। অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম যে অনেক অর্থেই আমরা বাইরের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকের কাঁচা প্রেম ভেঙ্গে গেল। অনেকেই সম্পর্ক বাঁচাতে অন্য কাজের সন্ধান করতে লাগল। তবে সবাই যে অসুখি ছিল তা নয়। বস্তু জগতের সাথে বৌদ্ধিক জগতের স্বাভাবিক বিরোধকে মেনে নিয়ে অনেকেই পরিপূর্ণ যৌবন শক্তি ঢেলে দিল নতুন কিছু আবিষ্কারের আশায়।




রূপরেখা


গরমের দুপুরে রিক্শা চালায় রিক্শাওয়ালা


আগেই বলেছি, মে মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম পরিচয় হয় আই-আই-টির সাথে, এক ভীষণ রুক্ষ পরিবেশে। মধ্য বা উত্তর ভারতে রুক্ষতা নতুন কিছু নয়। এপ্রিল যত শেষের দিকে এগোয় আমাদের IIT Kanpur এর  ক্যাম্পাস  প্রায় এক মৃত রাজকুমারীর চেহারা নেয়। মে জুন মাসে পিচ রাস্তার দিকে তাকানো যায় না। ঠোট ফাটে, হাত ফাটে। কয়েক বছর ধরে আবার কোথা থেকে হঠাৎ জলীয় বাষ্পের উদয় হচ্ছে। এই সময় মনে হয় এর থেকে নরক-পুরী আর কোথাও নেই। পরিবেশের সাথে শুরু হয় প্রযুক্তির যুদ্ধ। লাইব্রেরীতে AC চলতেই থাকে। ট্রাডিশনাল্ পড়ুয়া ছাড়াও সারা বছরে যে ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনায় “সচিন তেণ্ডুলকর”, তারাও এসে জোটে লাইব্রেরীতে। তিল ঠাঁই ধারণের জায়গা থাকে না কোথাও। বই হয় বালিশ। সারা বছর যে বই কেউ ছুয়েই দেখে না, মাথার স্পর্শে তারাই হয় জীবন্ত। বিদ্যা মগজে ঢোকাবার এর চাইতে সহজ ও সরাসরি প্রক্রিয়া আর কোথাও আবিষ্কৃত হয়েছে বলে আমি অন্তত শুনিনি। গবেষকদের মধ্যে যারা বাকি সময় অশোকের হল-৪ এ ক্যান্টিনের পাশে “বোধিবৃক্ষের” নীচে দেশ-কাল নিয়ে চিন্তায় ও আলোচনায় ব্যস্ত থাকে, তারাও হঠাৎ গবেষণাগারের প্রয়োজন অনুভব করে। সৌজন্যে সেই AC, অন্তত দুর্জনে তাই বলে!

ফলওয়ালাদের বিক্রি হঠাৎ করে বেশ খানিকটা বেড়ে যায়। বিশেষ করে নানা ফলের রস। আই-আই-টি কানপুরের এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যান্টিন হল হল-৪ এর ক্যান্টিন। মালিক আশোকও তাই বেশ জনপ্রিয়। এখানে হস্টেলগুলি “হল” নামে পরিচিত। এই হলেই আমি থাকি। আমাদের এই হলের পাশেই  গার্লস্-হস্টেল-১ বা সংক্ষেপে জি-এইচ-১. ওই হলের ক্যান্টিন খুব ভাল না। তাই সারা বছর নানা জাতের ও বর্ণের মেয়েরা খেতে আসে আমাদের ক্যান্টিনেক্যান্টিনের জনপ্রিয়তার এও এক প্রাকৃতিক কারণ! এছাড়া হল থেকে ল্যাব যাবার পথেও অনেক মহিয়ষীর সাথে দেখা হয়। কারণ জি-এইচ-২ যাবার পথও একই দিকে। ভীষণ গরমে এদের সংখ্যাটা হঠাৎ করে কমে যায়। অতি-বিরল প্রাণীর মত ! যাদের দেখা পাওয়া যায় তারা মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি ঢেকে রাখে। স্তণ্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে এদের শরীরই শোনা যায় সবথেকে সংবেদনশীল। গরমের ভীষণ তাপে গোটা আই-আই-টি কানপুর আরব দেশে পরিণত হয়। সন্ধ্যাবেলা সূর্যের তাপ বিকির্ণ হতেই অনেক রাত হয়ে যায়। ছেলেরা কুর্তা পরে, বারমুডা পরে। মেয়েদের পোশাকের বোঝাও অনেকটা কমে যায়। দিনে অদৃশ্য থেকে রাতে এরা হঠাৎ করে জেগে ওঠে, “অনেকটা ঠিক পেঁচার মত”, তবে এক মায়াবী সৌন্দর্য্য নিয়ে! 



ফলওয়ালারা


এখানকার প্রায় সব মেয়েই সুন্দরী। তবে সেটা মূলত গাণিতিক অর্থে; আক্ষরিক অর্থে কিনা জানিনা। বর্তমানে এখানে দশটা ছেলেদের হল আছে। সেখানে মেয়েদের হল মাত্র দুটি। তার মধ্যে একটি বেশ ছোট। তাই ছেলে মেয়ের আনুমানিক অনুপাত ১0:১. বিরল প্রজাতির কুৎসিত জীব হয় বলে আমি অন্তত কখনো শুনিনি। তাই অধিকাংশ ছেলেই বিশ্বাস করে এখানকার মেয়েরা হয় “সুন্দরী” না হয় “খুব সুন্দরী”তবে আমার ধারণা “সুন্দরীর” সংখ্যাটা “খুব সুন্দরীর” খেকে বেশ খানিকটা বেশী। 



সোমরস - এটা পান করা মানা


নারীবাদীদের দ্বারা মুণ্ডুচ্ছেদনের আগেই ছেলেদেরও কিছু বর্ণনা দেওয়া যাক্। তবে শারিরীক বর্ণনা দিতে পারব না, যদিও সুপ্রীম কোর্ট এখন অনুমতি দিয়েছে, তবুও না। অধিকাংশের মুখেই অবিন্যস্ত দাড়ি-গোঁফ। প্রথম দর্শনেই মনে হবে বির্বতনের ধারা আগের স্তরেই স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে। অনেকটা সেই “লম্ফ দিয়ে গাছে ওঠে লেজ নাই কিন্তু”র মত। অনেকেই দেশের সামগ্রিক জলকষ্টের বিষয়ে ভীষণভাবে সংবেদনশীল। এরই পরিণামে, তীব্র গরমেও অনেক বাথরুম দিবারাত্র শুকনো থাকে। শোনা যায় ফরাসী দেশের পারফিউম এদের শরীরের আদিম গন্ধকেই তার সবচেয়ে বড় শ্রেণীশত্রু বলে মনে করে। এদের অধিকাংশের ঘরই সুরভিত হয় দীর্ঘদিনের না কাচা জামা কাপড়ে। তবে সবাই যে এমন তা নয়। ঘরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য থেকে এদের ম্যারিটাল-স্ট্যাটাস সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়, তা ফেসবুক বা অরকুট এ যাই লেখা থাকুক না কেনো। কয়েক সপ্তাহ পর এদের জামা-কাপরণ্ডলি এক প্রাকৃতিক বির্পযয়ের সৃষ্টি করে। কাপরণ্ডলি কাচলে জলদূষণ অন্যথায় বায়ুদূষণ। ঘরের বাতাস এদের কাপড়ে বিষাক্ত হয়ে কত ধোপার যে জীবন-আলো নিভেছে তার ঠিক নাই। এই ধোপা সমাজকে দেখে ভবিষ্যত দ্রষ্টা কবি অনেক আগেই লিখেছিলেন “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু নিভাইছে তব আলো।”

পূজার সময় আই.আই.টির মিষ্টি বৌদিরা

                     
                     
                      
                        পুরান সম্বন্ধগুলো 

নদীর নাকি এপাড় গড়ে তো ওপাড় ভাঙ্গে! ফেলে আসা বন্ধুদের দিকে এবার একটু তাকানো যাক্‌। অরকুট বা জি-মেলের (এখন ফেসবুকটাকেও রাখতে হবে) চ্যাট-হিস্ট্রি খুললে দেখা যাবে যে, দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধুদের মধ্যে প্রথম বছরটায় বেশ প্রেমের জোয়ার বয়ে চলে। তারপর যত এদিকটা ভরতে থাকে, তত ওদিকটাও খালি হতে থাকে। অরকুট বা ফেসবুকেস্ক্যাপের হার কমতে থাকে। জি-মেলের ইনবক্স ভরে থাকে পুরান ই-মেলে অথবা সমাজসেবা মূলক কার্যে অণুপ্রাণিত করে পাঁচবার ঘুরে আসা কোনো ফরওয়ার্ডেড ই-মেলেকিছুদিন বাদে তাই হাতে গোনা কিছু বন্ধুর সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ থাকে। আরো কিছুদিন বাদে সংখ্যাটা প্রায় এক আঙ্গুলে গোনার মত যায়গায় পৌঁছায়। পুরাতন বন্ধুত্ব যখন ইতিমধ্যে তার অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, তখন বয়সের নিয়ম মেনে অনেকের জীবনে আসা বিশেষ সম্পর্কগুলি তাকে আরো ধরাশায়ী ও মুমূর্ষুপ্রায় করে তোলে। তাই দেখা যায়, যে বিশেষ কজনের সাথে কদিন আগেও নিয়মিত জি-টকে যোগাযোগ ছিল, সেখানে চ্যাটের সংখ্যা কোন গাণিতিক সূত্র না মেনে ভীষণ ভাবে আন্দোলিত হচ্ছে। কখনও চ্যাটের হার খুব ঘন-ঘন, যার অর্থ অন্য সম্পর্কটি ভাটার দিকে চলেছে। আবার কখনও বা চ্যাটের এর হার খুব কম, মানে যৌবন তার পরিপূর্ণতার দিকে এগোচ্ছেতারপর কিছুটা ধোঁয়াশা-ধোঁয়াশা এবং দীর্ঘ্য নীরবতা। সবশেষে হঠাৎ একদিন নিমন্ত্রণ প্রাপ্তি, যার অর্থ ওদিকের দরজাটি প্রায় বন্ধ, ধাক্কা দিতে পার তবে লাভের আশা না করে।

জি.পি.এল – এটা একটা সামাজিক অনুষ্ঠান




শৈশব

এখানে  পি-এইচ-ডি ছাত্রদের  সামনে প্রথম বছর (পড়ুন ব্রম্ভচর্য অবস্থায়) কোর্স-ওয়ার্ক  বলে একটা ‘আধ্যাত্মিক’ বিষয় উপস্থাপিত করা হয়। শৈশব থেকে প্রথম যৌবন পর্যন্ত বিজ্ঞান বিষয়ে অর্জিত সকল জ্ঞানের আত্তীকরণ এই কোর্স-ওয়ার্কের মুখ্য উদ্দেশ্য। এই সময় কাঁড়ি-কাঁড়ি এসাইনমেণ্ট নিয়ে আমরা সাধারণত বসতাম কোন এক বন্ধুর ঘরে। এসাইনমেণ্ট, ক্লাস এবং নামমাত্র ঘুমাবার সময় বাদ দিলে, বাকি সময় আমাদের দেখা যেত হয় অশোকের ক্যান্টিনে অথবা টিভি ঘরে। এই ক্যান্টিনে বসার সময়ই দেখতাম বেশ কিছু সিনিয়র ছাত্রকে, যারা সারাদিন ক্যান্টিনে ঢোকে আর ক্যান্টিন থেকে বের হয়। কখনো বা ক্যান্টিনের পিছনে বসে দলবেধে ধূমপান করে। অল্প কিছুদিন পরে জেনেছিলাম যে এখানে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে এরা আই-আই-টি কানপুর বিষয়ে বহু অভিজ্ঞ। স্মরণাতীত কাল থেকে এরা পি-এইচ-ডি করে চলেছে। বহু বিশ্বকাপ ক্রিকেট এখানে বসেই দেখেছে। অনেক অধ্যক্ষকে আসতে-যেতে দেখেছে। সামান্য অতিরঞ্জন করে কেউ কেউ বলে এরা নাকী জলবায়ুর পরিবর্তন হতেও দেখেছে। ফলে আই-আই-টি কানপুরের প্রত্যেক ধুলিকণা সম্বন্ধেও প্রভূত এদের জ্ঞান। তাই এরা জ্ঞানবৃদ্ধের মত বসে থাকে। কালে-কালে আই-আই-টিকে ভালবেসে এখানেই থাকার ব্যাপারে মনোস্থির করেছে। ঠিক যেন মেরে না তাড়ালে যাবে না। বর্হিবিশ্বের খুব কম জিনিসই আছে যা এদের না জানা অনেকটা “গবেষক গবুচন্দ্রে”র মত। আই-আই-টি কানপুরের অনেক ভেতরের খবর এদের কাছ থেকে জেনেছিলাম। এখানে শিক্ষক এবং প্রশাসকদের একটা বড় অংশ যে পি-এইচ-ডি ছাত্রদের ‘’তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক’’ বলে মনে করে তা প্রথম এদের কাছ থেকেই জেনেছিলাম। পরবর্তিকালে প্রশাসনের উচ্চস্তরে বসে থাকা কারো-কারো বক্তৃতাতেও উপরের বক্তব্যের আংশিক সত্যতার আভাস দেখা গেছে।


হল-৪ এর শুভদা- ডারউইন কি ভুল ?




                        
                            স্বদেশ  

এই ক্যান্টিনে বসেই আর একটা বিষয় মনকে প্রবল ভাবে নাড়া দিত, যা এখনও দিয়ে চলে। এখানকার প্রায় অধিকাংশ ক্যান্টিনের কর্মচারীরা বেশ নাবালক। দিনরাত অন্যের হুকুম খেটে চলে। দেখলে অনেকটা “সাড়ে চুয়াত্তর” সিনেমার মদনের (নবদ্বীপ হালদার) কথা মনে পড়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এদের অনেকের বয়সই পনেরের কম। এদের কে আশেপাশের গ্রাম থেকে নিয়ে আসে ক্যান্টিন মালিকেরা। দারিদ্রক্লিষ্ট পরিবারগুলিও দু-চার পয়সার জন্য তাদের কচি ছেলেগুলোকে ছেড়ে দেয় মালিকদের হাতে। শিশু শ্রমিক আমাদের দেশে নতুন ঘটনা নয়, কিন্তু আই-আই-টির মত সর্বালোকপ্রাপ্ত জায়গাতে শিশু শ্রমিক ঠিক কি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা পাঠায় সেটাই বোধহয় ভাববার বিষয়। এই পাঁচ বছরে এখানে মানব অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কত-শত যে বক্তৃতা হয়েছে তা গুনে বলা শক্ত, অথচ এদের অবস্থার কোন গুণগত পরিবর্তন হয়েছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। আজকের পৃথিবীতে যেখানে সবাই “হিপোক্রাইট” সেখানে আমাদের মত প্রতিযোগিতাপ্রিয় আই-আই-টিয়ানরা পিছিয়ে থাকবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই! রাজনৈতিক শুদ্ধিতার জন্য শুনেছি এদের সবার বয়স আসলের থেকে বেশ বেশী করে নতিভুক্ত করা হয়। সরকারি নীতি অনুযায়ী সঠিক পয়সা যাতে এরা পায় সে নিয়ে ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদিও সবসময়ই সংবেদনশীল পদক্ষেপ নিয়েছে, তথাপি দিবারাত্র শুকনো মুখের, হাড় জির-জিরে চেহারার বাচ্চাগুলোকে অন্যের হুকুম খাটতে দেখলে এখন আর দুঃখ হয় না, নিজের প্রতি ঘেন্না হয় মনে হয় নিজের অর্জিত সমস্ত ডিগ্রীতে মূত্রত্যাগ করি। পাঠিকা/পাঠক অশ্লিলতার জন্য মার্জনা করবেন, কিন্তু এর থেকে সত্যি অভিব্যক্তি আমার কাছে বর্তমানে নেই। তবে এদের জন্যই প্রযুক্তির বাহারে ঢাকা আমেরিকাবৎ জনারণ্যে কোথায় যেন “টেন পার্সেন্ট ইকোনমিক গ্রোথের” প্রকৃত স্বদেশের মুখ চোখে পড়ে ! 


শহরের কথা


কৈশর

দ্বিতীয় বছর থেকে হঠাৎ দেখলাম জীবনে একটা কি যেন পরিবর্তন এল। ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই, ক্লাসমেটদের সাথে দিনরাত বসা নেই। বিনিময়ে শুরু হল গবেষণাগার কেন্দ্রীক এক অন্যরকম জীবন। গবেষণাগার; প্রচণ্ড গুরুগম্ভীর এই শব্দটা, সর্ব-বিষয়ে সংক্ষিপ্তপ্রিয় আই-আই-টিয়ানদের ভাষায় যাকে ‘’ল্যাব’’ বলা হয়, জীবনের রহস্য-রোমাঞ্চ-সুখ-দুঃখের প্রতীক হয়ে রইল। “কেয়া ল্যাব নাহি যাওগে?”- বিভিন্ন ভাষাতে এই শব্দটা যে কতবার শুনেছি তার হিসাব বোধহয় বুদ্ধবাবুর সিগারেট খাওয়া বা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের দল পরিবর্তনের সাথে তুলনীয়। এখানকার বিভিন্ন ল্যাবগুলিতে সেই অর্থে কোন সাধারণ নিয়ম নেই। ল্যাবের সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক বা গাইডের উপর নির্ভর করে সেই বিশেষ ল্যাবের নিয়ম-নীতি কোন-কোন গাইড যেমন পছন্দ করেন ছাত্ররা এক বিশেষ সময়ে কাজ করুক, তেমনি অনেকেই সময়ের স্বাধীনতা ছাত্রদের হাতেই ছেড়ে দেন। এই সময়েই নবাগত গবেষকেরা প্রথম আবিষ্কার করে যে, জীবন একটা লোকের উপর বড় বেশী নির্ভরশীল- তার নাম গাইড। সেই কারণে আড়ালে আবডালে গাইডকে “বাপ” বা “পিতা” বলেও ডাকা হয়। অবশ্য যাদের মহিলা গাইড তারা কখনও “মা” বলেছে বলে শুনিনি। সে যাই হোক্‌, ভারতীয় রীতি মেনে প্রথম প্রথম সবাই বাবা-মার প্রতি বিরাট শ্রদ্ধাশীল থাকে। তাঁদের এযাবৎ অজ্ঞাত অনেক গুণকীর্তন নবাগত ছাত্র বা সন্তানদের মুখে লোকপ্রিয় হয়। সিনিয়ররা আড়ালে মুখটিপে হাসে। তারপর সময় যত এগোতে থাকে শ্রদ্ধার পূর্বরাগে কোথায় যেন মধ্যযৌবনের ক্লান্তি চোখে পড়ে। অবশেষে বার্ধক্যের খিটখিটিনি। এরপর হয় মধুরেণ সমাপয়েৎ যদি ভাল “রেকো” পাওয়া যায়, না হলে “চিরকালীন শ্রেণীশত্রুতা” নিয়ে বিদায়।


ক্যাম্পাস রেস্তোরা – এখানে টয়লেট নেই




সাদার্ন ব্লক 

এই সেই “ঐতিহাসিক” সাদার্ন ব্লক ল্যাবরেটরিস, যার নীচের তলার এক-কোনে আমার ল্যাব। শেষ চার বছরে ঠিক কতটা সময় এখানে কেটেছে তার হিসাব কষা শক্ত, বরং সহজ হিসাব হবে যতটা সময় এখানে কাটেনি তারফিজিক্স এবং কেমিষ্ট্রির অনেক ল্যাব এই ব্লকে অবস্থিত। আর আছে একটি ক্যান্টিনএটি ফ্যাকাল্টি লাউঞ্জ নামেও পরিচিত। খুব সাম্প্রতিক একজন নতুন কন্ট্রাক্টার এসেছে এর আগে দীর্ঘদিন তিন টাকার চা আর চার টাকার স্পেশাল চা পাওয়া যেত তবে একটা টাকা অতিরিক্ত দেওয়া ছাড়া চায়ের “স্পেশালতা” ঠিক কোন্‌ জায়গায় ছিল বলা মুশকিল। তাই অভিজ্ঞ চা-পায়ীদের সাধারণতঃ স্পেশাল চা খেতে খুব একটা দেখা যেত না। এছাড়া পাওয়া যেত সিঙ্গাঁড়া, পকোড়া, বিস্কুট, কোল্ড্রিঙ্কস্‌ ইত্যাদি ইত্যাদি কিছু জাতীয় এবং বিজাতীয় জিনিস। পুরানো ক্যান্টিনটাতে একটা সর্বজনীন ভাব ছিল। কম পয়সায় সব পাওয়া যেত। সব যে সুস্বাদু ছিল তা না, তবে পয়সার অনুপাতে পুষিয়ে যেত। আর “ইনফরম্যাল” বা দেশী আপ্রোচের জন্য একটা নিজের বলে মনে হত। নতুন কন্ট্রাক্টর আসার পর থেকে এর খলনলচে প্রায় পালটে ফেলার উপক্রম করা হয়েছে। তাতে এখন অবধি যা ফল, জিনিসের দাম বাড়া ছাড়া অন্য কোন লাভ হয়েছে বলে চোখে পড়েনি। পড়লে পরবর্তি লেখায় জানাব। সে যাই হোক্‌, এটা বলা হয়ে থাকে যে দিনে তিন থেকে চার কাপ চা এই ক্যান্টিনে না খেলে, এই ব্লকে কারোর পি-এইচ-ডি পূর্ণ হয় না। শুধু যে এই ব্লকের লোকজনই এখানে চা খেতে আসে তা নয়, সোম থেকে শনি একাডেমিক্‌ অঞ্চলের বহু লোকজনই এসে থাকে চা বা জলযোগের প্রয়োজনে সকালে-বিকালে। 


চায়ের আশায় বসে আছি ওরে আমার মন



আমরা-ওরা

(১)

এখানকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টগুলোর মধ্যে ছাত্রসমাজের কাছে ভীষন গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেণ্ট হল বায়োলজিক্যাল সায়েন্স। কারণ নবনির্মিত এই ডিপার্টমেণ্টে যারা বাস করে তাদের প্রায় অর্দ্ধেকই অতিবিরল প্রজাতির। পুরো ক্যাম্পাসে যেখানে বাস্তুতান্ত্রিক শ্রেণীসাম্য বিপর্যস্ত, সেখানে একগুচ্ছ অতিবিরল প্রাণীর উপস্থিতি যে আলাদা আদরের দাবী রাখে তা বলাই বাহুল্য। “বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে” অন্যান্য বিষয়ে হলেও এবিষয়ে অথোরিটি কৃপণতা করে না তাই এদেরকে যথেষ্টই আদর-যত্ন করা হয়। না চাইলেও করা হয়। যেতে চাইলেও কাউকে সহজে ছাড়া হয় না। যার পরিণামে দীর্ঘমেয়াদী পি-এইচ-ডিতে বিশ্বাসীদের তালিকায় ফিজিক্স ছাড়া এদের সাথে টক্কর নিতে পারে এমন ডিপার্টমেণ্ট আর আই-আই-টি কানপুরে নেই। 

এ প্রসঙ্গে এবার একটা সামাজিক ধ্যান-ধারণার কথা বলা যাক্‌। এটা বাজারে প্রচলিত গল্প। আমার কোন দায়বদ্ধতা এখানে নেই। আমি নিজে যে নিম্নোক্ত ধারণাটির বিরাট বিশ্বাসী এমনও নয়। তাই নীচের লেখাটি পড়ার পর মুণ্ডুপাতের ইচ্ছা হলে দয়া করে আমারটা ছেড়ে দেবেন। ডাক্তার বা ইঞ্জিয়ারদের বাদ দিলে, সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, যারা উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে অঙ্কে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না তারাই বায়োলজির দিকে ঝোঁকেঅন্যদিকে বুদ্ধির সাথে সৌন্দর্যের কোথায় যেন এক চির-বিরোধ! অন্তরে-বাহিরে-মস্তিষ্কে একত্রে সুন্দর এমনটা বড় একটা দেখা যায় না। এরই পরিণামে কিনা জানিনা, তবে যে কোন সময়ে দেখা গিয়ে থাকে যে, এখানকার প্রায় অর্দ্ধেক সুন্দরীই বায়োলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের তাই কোন অচেনা সুন্দরীর আচমকা দেখা পেলে প্রথমেই ধরে নেওয়া হয়- এটি হয় গাছ কাটে নাহলে ব্যাঙ্‌ কাটে। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। সেই কারণে এদের অনেকেই মাঝে-মধ্যে চা পানেও বিশ্বাসী। বায়োলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট থেকে দুটি ক্যান্টিন প্রায় সমদূরত্বে অবস্থিত। একটি “কেমিকেল ক্যান্টিন” এবং অন্যটি আমাদের মানে উপরিউক্ত “ফ্যাকাল্টি লাউঞ্জ” বা “সার্দান ব্লকের ক্যান্টিন।” তাই গাণিতিক সম্ভাবনার সূত্র মেনেই প্রায় অর্দ্ধেক রমণী ওখান থেকে “ব্যাঙ্‌ কাটা হাতে” চা খেতে আসে আমাদের পাড়ায়দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক পর্যবেক্ষনের ফলে একটা সময় ধ্যান-ধারণা তৈরি হয়ে যায় কোন্‌ দল কখন আসবে। মুখ বা পেট না চাইলেও দেখেছি এই সময় অনেকেরই মন চায় চা খেতে।
  
  (২)




ভাবছে না ঘুমাচ্ছে ? আগের রাতে ইয়ে ছিল হয়ত !


আমাদের বায়োলজির বন্ধু-বন্ধুনীরা যখন সাপ-ব্যাঙ, গাছ-পালা, মশা-মাছি ইত্যাদির জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে হিমশীতল গবেষণা কক্ষে, তখন পদার্থবিদ্‌দের পদার্থপ্রীতির প্রতি একটু তাকিয়ে নেওয়া যাক্‌। যারা গরিব পিতার সন্তান, মানে যাদের গাইডদের কাছে বিশেষ ফান্ডিং নেই, তাদের মা-মাটি-মানুষের স্বার্থে জগতের হেন কাজ নেই যা না করতে হয়। কাঠ কাটা, ধাতু কাটা, তরল নাইট্রোজেন বা হিলিয়ামের পাত্র বয়ে নিয়ে আসা এবং আরো নানাবিধ। তাই সর্ব অর্থেই এই শ্রেণীর ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলকে গৃহকর্মে সুনিপুণ(-সুনিপুণা) করে গড়ে তোলা হয়অপক্ককেশ পিতার সন্তানদেরই সাধারনতঃ এমন জগত-বিশ্ব সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ হওয়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকেতবে এই শ্রেণীর পিতারা নবাগত হওয়ার দরুন সন্তান সম্পর্কে সাধারণত স্নেহশীল হয়ে থাকেন এবং কাঠ বা ধাতু কাটার মত বিরাট কর্মযজ্ঞে এঁদের অনেককেই সরাসরি অংশ নিতে দেখা যায় দুষ্টু সম্প্রদায়ের জীবনাভিজ্ঞ কেউ কেউ বলে থাকেন যে প্রমোশন নামক বস্তুটিই নাকী এহেন সন্তান স্নেহের মুখ্য কারণ। তবে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশুদ্ধ বিজ্ঞান-প্রীতিও অনেককে টেনে আনে কাজের মূল স্রোতে। অন্যদিকে, যে সমস্ত ছাত্ররা ধনতান্ত্রিক পিতৃত্বের স্বীকার, তাদের গৃহকর্ম একটু কম করতে হলেও আন্তর্জাতিকতার চাপে পিতৃস্নেহ থেকে এরা প্রায়ই বঞ্চিত হয়ে থাকে শতাধিক বিষয়ে পদাধিকারী হওয়ার দরুণ, ধনতান্ত্রিক পিতাদের প্রায়ই মিটিং, মিছিল, ফান্ডিং এবং আরো নানাবিধ বৈজ্ঞানিক, অবৈজ্ঞানিক বা বৃহত্তর স্বার্থে কখনও-সখনও অপবিজ্ঞানমূলক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এটা যে শুধু পদার্থের ধর্ম তা নয়, শরীর, রসায়ন, প্রযুক্তি যে দিকে তাকানো যায়, ধনতান্ত্রিক পিতৃত্বের এই আন্তর্জাতিক চরিত্রটি সাধারণত চোখে পড়ে। তবে এঁদের অনেকের আত্মত্যাগ স্মরণযোগ্য, অনেকটা স্বামী বিবেকানন্দের সাথে তুলনীয়। কেননা, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত গরমের ছুটির সময় যখন বাকী সকলে কানপুরে সান-বাথ উপভোগ করে, এঁদের অনেকেই তখন কখনও সস্ত্রিক কখনও বা অস্ত্রিক দেশ ছেড়ে সুদূর মার্কিন-মুলুকে কিংবা ইউরোপে পাড়ী দেন; দেশের কথা প্রচার করতে। অবশ্য কিছু নন-ইনটেলেকচুয়াল ফালতু লোক এনাদের এই আত্মত্যাগকে শিল্পসন্ধানী জ্যোতিবাবুর গ্রীষ্মাবকাশে লন্ডণ যাত্রার সাথে তুলনা করে থাকেন আমরা সে সব কথায় কান দিই না।


(৩)


এটা মাছের বাজার নয়


পাঠিকা/পাঠক, “হীরক রাজার দেশে” সিনেমার সব চরিত্রের কথা মনে পড়ে? যদি পড়ে তা হলে নিম্নলিখিত প্রস্তাবটি পালন করুন। কৃষক ফজল মিঁয়া বা শ্রমিক বলরামকে বিজ্ঞানী গবুচন্দ্রের জায়গায় কল্পনা করুন। এরপর চোখবুজে মিনিট দশেক ভাবুন। যদি কিছুই বুঝতে না পারেন তা হলে আসুন আমাদের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। সব পরিস্কার হয়ে যাবে। তবে এটি গণতান্ত্রিক বিভাগ। তাই এখানে অনেক হীরক রাজা আছেন। হীরক রাজাদের প্রবল বাসনা, ভাটনগর আনা। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন প্রবল কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞের পুরোহিত (পড়ুন শ্রমিক) হিসাবে ধরে আনা হয় এগগাদা ছেলে-মেয়েকে। তবে এসবের একটা ইতিহাস আছে। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে, পণ্ডিত নেহেরু চিন্তা করলেন দেশ তো স্বাধীন হল কিন্তু এত লোকের কর্ম সংস্থান হবে কি ভাবে? তখন পণ্ডিতেরা পরামর্শ দিলেন যে কেমিক্যাল হাব্‌ খুলুন, অনেকের চাকরি হবে। এরই শাখা হিসাবে খোলা হয় এখানকার রসায়ন বিভাগ। প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ্‌ প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ  আর ‘সাহিত্য-রসায়নী’ পরশুরা মিলে হিসাব কষে দেখালেন- একজন বাবু প্রতি প্রায় দশজন মজুর কাজ পাবেন। হিসাব মিথ্যে হয়নি। বিশ্বাস না হলে নিজের চোখে দেখে যান আই-আই-টি কানপুরের সমগ্র পি- এইচ-ডি ছাত্রদের প্রায় পঞ্চাশ প্রতিশত এই ডিপার্টমেন্টের সদস্য। একে বিভিন্ন ধরণের দুর্গন্ধযুক্ত তরলপদার্থ নিয়ে এদের কারবার, তার ওপরে আবার অবস্থা হারাধনের দশ ছেলের মত। দু-চারটে বাঘের পেটে গেলেও কারো কিছু যায়-আসে না। বিশাল-বিশাল গবেষণাগৃহগুলিতে ঝাঁকে-ঝাঁকে ছেলে-মেয়েরা ভাটনগর যজ্ঞের কারিগর হিসাবে কাজ করে। এরা কাজ করে  দিবা-রাত্র। এরা কাজ করে সর্বত্র, মাঠে-ঘাটে-হাটে-জলে-জঙ্গলে।  “ওরা কাজ করে” তবু কোনো রবীন্দ্রনাথ এদের কথা লেখে না। এরা রানারের মত ছুটে বেড়ায়, তবু কোনো সুকান্ত এদের দেখে না। সারা দিন, সন্ধ্যা এবং প্রথম রাত্রির পর, যখন এই ভাগ্য বিরন্বিতের দল কাজ সেরে ঘরে ফেরে, তখন এদের অনেকেরই আর মনুষ্যবোধ থাকে না। কেউ শুড়িখানার দ্বারস্ত হয় আবার কেউ বা মনে মনে সংশ্লিষ্ট হীরক রাজার মুর্তিতে বিশেষ দ্রব্য বর্জন করে। কিন্তু হায়রে! বিধাতাও শোনে না এদের রব। 


নার্সের (সিস্টার) ভালবাসা




জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

অনেক হল। এবার আসুন কবিগুরুকে স্মরণ করি, তাঁর ১৫০-তম জন্মবার্ষিকীতে। এই সেই পবিত্র স্থান, দুটি গার্লস হোস্টেল থেকে প্রায় সমদূরত্বে অবস্থিত, যেখানে বসে তিনি বহুদিন আগে রচনা করেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান- “জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে”এখানেই “দু বাহু বাড়ায়ে” দাড়িয়ে থাকেন অজস্র ডাক্তার, নার্স এবং আরো অন্যান্য কর্মচারীর দল, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রণক্লান্ত আই-আই-টিয়ানদের “মুক্তি”র সন্ধান দিতে। “বিধান রায় তুল্য” এবং যুক্তিপ্রিয় এখানকার অধিকাংশ চিকিৎসক মনে করেন যে যন্ত্রনা বা পেনই হল সব সমস্যার মূলে। তাই যেকোন রোগ নিরামূলের জন্য প্রথমেই যন্ত্রণার অবসান চাই, তা সে শারিরীক বা মানসিক যে যন্ত্রণাই হোক না। সব যন্ত্রণাই যে আসলে বৃহত্তর জীবন যন্ত্রণার অঙ্গ! তাই যে কোন রোগ সারাতে অনেকেই এক বিশেষ ধরণের “পেনকিলার” দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এক অসুধে যে এত প্রকারের যন্ত্রণার প্রশমণ হয় তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্রোফেসর শঙ্কু, সত্যজিৎ রায় যাঁর অনেক সুখ্যাতি করতেন, তাঁকেও নাকী তাঁর বিখ্যাত “মিরাকিউরল” বা “সর্বরোগনাশক” বড়িটি আবিস্কারের পূর্বে এখানে প্রায়ই ঘোরাঘুরি করতে এবং এখানকার “পেনকিলার” বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করতে দেখা যেত দ্বিতীয় শ্রেণীর আর একপ্রকার ডাক্তারবাবুরা আছেন যাঁরা অনেকটা দার্শনিক ঘরানার। এঁরা সর্বজীবে সমভাব ও সমতায় বিশ্বাস করেন মানুষ যে গিনিপিগ, মুরগী বা ইঁদুর থেকে কিছুটা আলাদা এবং কিছু অতিরিক্ত পার্থিব সুবিধার অধিকার দাবী রাখে, তা এনারা মানেন না। বিশেষ করে এখানকার ছাত্র বা ছাত্রীরা যে উপরিউক্ত ত্রিবিধ প্রাণিদের এক বিশেষ রূপ, এ নিয়ে এনাদের মনে কোন দ্বিধা বা দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই। তাই বায়োলজির গবেষণাগৃহে যে ভাবে গিনিপিগ, মুরগী বা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালানো হয়, এঁরা সে ভাবেই নিজেদের মস্তিস্কপ্রসূত অদ্ভুত সব উদ্ভাবনী ছাত্র বা ছাত্রী-রূপী গিনিপিগদের উপর প্রয়োগ করেন। হার না মানা মানসিকতার এই “চির-তরুণ তুর্কি”র দল যে কোন কঠিন রোগের চিকিৎসা করতে মোটেই পিছপা হন না, বিশেষ করে তা যদি ছাত্র-ছাত্রী সম্বন্ধীয় হয়ে থাকে। পঞ্চ-ইন্দ্রিয় সম্বন্ধে এমন প্রখর প্রজ্ঞা সচরাচর দেখা যায় না। এঁদের প্রজ্ঞালোকে প্রজ্জ্বলিত হবার সৌভাগ্য, কর্মফলের গুণে এই নরাধম লেখকের কয়েকবার হয়েছে। সামান্য চামড়ার সংক্রমণকে (স্কিন ইনফেকশান) কিভাবে চিরস্থায়ী দাগে পরিণত করা যায়, তাও এনারা দেখিয়েছেন আমার দক্ষিণ হস্তের উপর এনাদের জ্ঞানালোক নিক্ষেপ করে। পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারবাবুটি বিবেকানন্দ ভক্ত। গুরুর কথা মেনে “যাবার আগে” উনি একটি দাগ রেখে গেলেন আমার হাতে।


ওগো বিদেশিনী


পরিশেষে

লেখাটা আমি এখানেই শেষ করছি। জানি কিছুই বলা হল না। আমাদের বিখ্যাত ক্যাম্পাস রেস্টুরেন্টের কথা। মাত্র তিনটে ডিপার্টমেন্ট বাদ দিলে বাকিগুলোর কথা। শিক্ষকদের কথা, বিশেষ মানুষগুলোর কথা এবং আরো কত কি ! আসলে আর শক্তি পাচ্ছি না। আগেই বলেছি, লেখাটা শুরু করেছিলাম ২০০৯ সালের ডিসেম্বর নাগাদ। আর এটা ২০১১ র সেপ্টেম্বর। তখন ছিলাম কানপুরে, ঘটনাস্থলের কেন্দ্রবিন্দুতে, আর আজ বেশ দূরে। মাঝখানে বহুদিন কিছু লিখি নি। ভাল লাগেনি। পি-এইচ-ডি জীবনের দিন যত শেষের দিকে এগোয়, মানসিক শক্তিতে কোথায় যেন ভাটা পড়ে। শেষ কয়েক মাসে বয়স হু-হু করে বাড়ে। ভাষা জ্ঞান কমে যায়। হৃদয়ে জং ধরে। আমিও তাই শেষ করছি এই জং ধরা হৃদয় নিয়েই – কিছু পরশের আশায়।









                                    
 

Comments

  1. PhD karar por ei prothom akta bangla lekha puro ta porlam.....osadharon!!!!satya bachon....

    ReplyDelete
  2. ei lekhata to ardhek likhe pathiyechilis, sesh korar jonye ajoshro dhanyobad!!! :-) -AKDe

    ReplyDelete
    Replies
    1. ebar Bangali-der (including IITK er "Bongiyo Samiti") niye akta aantelnama lekh... :-)

      Delete
  3. khub bhalo likhecho Dibyenduda...... jader samparke lekha holo na tader nie 2nd part parar apekhai thaklam..........

    ReplyDelete
  4. শুরু করে শেষ না করে পারলাম না.... দারুন লিখেছ দাদা... একদম মন থেকে মন পর্যন্ত...

    ReplyDelete
    Replies
    1. bhai porar jonno dhyannabad....hall 4 canteen er bhalo chobi thakle pathas ...akhane lagabo

      Delete
  5. bohudin por akta lekha aktana pore gelam.....osadharon

    ReplyDelete
  6. Puro Moner kotha bolecho dada....

    ReplyDelete
  7. khub bhalo legechhe... chaliye ja... amra abar parbo..

    ReplyDelete
  8. Maneta aj khub bhalo bujhlam Dibyendu da!! :) r nissondehe khub bhalo lekha hoeche :)

    ReplyDelete

Post a Comment