চিঙ্কুয়ে ত্যারে



চিঙ্কুয়ে   ত্যারে 


   মুখবন্ধ

অনেকবার ইতালি ঘুরতে গেছি।  পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কলা, ইতিহাস, খাবার, পানীয়—  যা খুশি কল্পনা করো, কি নেই ইতালিতে!  আর আছে চনমনে স্বভাবের কত মানুষ। আমোদে, প্রমোদে হই  হুল্লোড় করে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে তারা। গত বছর গিয়েছিলাম পিসা (Pisa), ফ্লোরেন্স (Florence) আর  চিঙ্কুয়ে ত্যারে (Cinque Terre) ঘুরতে।

পিসা আর ফ্লোরেন্স এর বৈভবের কথা তোমরা অনেকেই জানো। মায়ের কাছে আমি আর মাসির গল্প করতে চাইনা। এ লেখার মূল উদ্দেশ্য চিঙ্কুয়ে ত্যারে ও তার আশেপাশের যে সমস্ত জায়গা ঘুরেছি — বিশেষ করে  পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, খাবার দাবার আর মানুষ জন — তার বর্ণনা ও কিছু অনুভূতি সবার সাথে ভাগ  করে নেওয়া।  সিংহভাগ সময়টাই কেটেছে পাহাড়ে চড়ে, পাহাড়কে ডিঙিয়ে, আর পাহাড়ের বুকে, জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে । সে কথাই এখানে উঠে আসবে বারবার।

ইউরোপের মাথা থেকে নাভি হয়ে আরো নিচে। 

কোন সুদূরে

ইহাই চিঙ্কুয়ে ত্যারে বা পাঁচটি গ্রাম। 

প্রায় এক বছর আগের ঘটনাবলী এখানে বর্ণিত সে অর্থে যেন অতীতে ফিরে যাওয়া। অথচ এই অনতিদূর অতীতের স্মৃতি চোখের সামনে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে বারবার। চোখ বন্ধ করলে প্রজ্জ্বলন আরো বেড়ে যায়। রোমাঞ্চ জাগে। এক হিমশীতল শিহরণ খেলে সারা শরীর জুড়ে। অনাগত অতীত  বর্তমানের রূপ নেয়। আমার  এ লেখায় তাই বর্তমান আর অতীতকাল মিলে মিশে এক হয়ে গেছে, এক অপটু হাতের অসহনীয় গুরুচন্ডাল দোষের মত।

আর একটা কথা। নির্ভুল, নিঁখুত লেখার দায়  নিয়ে আমি লিখতে বসিনি আমি  সৌমি রায়, সত্যজিৎ রায় আমার কেউ হয় না। এই লেখা উপলব্ধি নির্ভর। স্থুল বুদ্ধির চৈতন্যে, আকস্মিক দর্শনে, যা তাৎক্ষণিক ভাবে অনুভূত হয়েছে, তাই লিখেছি। তাই যেটাকে হয়তো আমার তখন দেখে পোড়ো বা পরিত্যক্ত বাড়ি মনে হয়েছে, সেটা হয়তো আদতে কোন ঐতিহাসিক তোরণ।  কিন্তু কে এসবের ধার ধারে? আমি তো তোমাদের জন্য লিখছি। 
     
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শুরু করা যাক।  আমি লিখেছি বটে কিন্তু দিব্যেন্দু বেশ যত্ন করে সম্পাদনার কাজটি করেছে।  ওকে কৃতিত্ব দিতে হবে। অনেক সময় ও আমার ভাষার উপরে নির্মমভাবে কলম চালিয়েছে।  তবে হ্যাঁ, আমার মূল ভাবটা ঠিকই অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করেছে।  কৃতজ্ঞতা জানাই বিশিষ্ট বন্ধু মাম্পি আর সূর্যকে, যারা আমাদের এ জায়গাটা যাবার কথা বলেছিল।

ইস্টারের (Easter) সময় ইউরোপে দুদিন ছুটি থাকে — শুক্র  আর সোমবার।  মাঝে সপ্তাহান্তের ছুটি। অফিস থেকে আর এক বা দুদিন ছুটি জোগাড় করতে পারলে, প্রায় পাঁচ বা ছয় দিনের টানা ছুটি।  মার্চের শেষ বা এপ্রিল মাসে ঠান্ডা অনেকটাই কমে যায়। সব মিলে বেড়ানোর বেশ ভাল সময়।  আমাদের কপাল ভাল ছিল। দিব্যেন্দুর বস ওকে দুদিন ছুটি দিল। আমার কোন বন্ধন তখন এমনিতেই ছিল না। তাই বেরিয়ে পড়লাম এই সময়টাতেই।

বেড়াতে যাবার ক্ষেত্রে চাকুরীজীবি মধ্যবিত্তের — আর্থিক ও মানসিক উভয় অর্থে — দুটি সমস্যা থাকে: অর্থ আর সময়।  একই  দেশের একই  অঞ্চলে  বারবার বেড়াতে যাওয়া সম্ভব না। লক্ষ্য থাকে এক বারে  যতটা বেশি ঘুরে  নেওয়া যায়। তাই থাকার জায়গাটা মাথা খাটিয়ে নির্বাচন করাটা বেশ জরুরি। আমরা ভাবনা চিন্তা করে ঠিক করলাম লা স্পেৎজিয়া (La Spezia) তে থাকব। এর  উত্তরে চিঙ্কুয়ে ত্যারে, যা আমাদের এবারের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।  আর এর মোটামুটি দক্ষিণ দিকে ফ্লোরেন্সে আর পিসা।  সব কটা জায়গাই ট্রেনে বেশ ভালভাবে সংযুক্ত।  তাই ধান্দাটা হচ্ছে যতটা বেশি সম্ভব  চিঙ্কুয়ে ত্যারে তে  সময় কাটানো, আর এর মাঝেই সময় সুযোগ বুঝে ফ্লোরেন্স আর পিসা দুটোই ঢুঁ মেরে আসা। 

আমাদের যাত্রা শুরু 

হেলসিংকি থেকে বিমান ধরলাম বিকালের দিকে।  বিমান যখন রোমে গোঁত্তা মারল, তখন ওখানে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রোম থেকে লা স্পেৎজিয়া, ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল।  প্রথমে রোমের মূল বিমানবন্দর থেকে সেন্ট্রাল ট্রেন স্টেশনে আসতে হবে। হাতে অফুরন্ত সময় ছিল।  বাসে চেপে, ধীরে সুস্থে, এলাম। রোমে আগে এসেছি।  প্রথমবার ইতালি ভ্রমণ রোমকেই কেন্দ্র করে ছিল। চেনা জানা সব ঐতিহাসিক অট্টালিকাগুলো চোখে পড়ল।  একরাশ স্মৃতি মনে ভিড় করে এল। সত্যি বাবা! এক শহর বটে!  যেদিকেই তাকাবে মনে হবে ইতিহাস চেয়ে আছে তোমার দিকে— হয় গ্রাহ্য না করে তোমায় দেখছে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে, অথবা করুণা দেখাচ্ছে তোমায় তার আতিশয্যে  গর্বান্ধ হয়ে,  অথবা তোমায় খুব সস্তা ভেবে  দাম্ভিক জমিদারের চ্যাংড়া ছেলের মত  চোখ মারছে।

মনকে রোমের এই আতিশয্যে ভাসতে দিলে চলবে না।  এবারের লক্ষ্য অন্য।  তাতে স্থির থাকতে হবে। বাস এসে থামল ট্রেন স্টেশনের প্রায় গায়ে । কাছেই ভাল খাবারের দোকান ছিল।  ভিড়ে ভিড়াকার। সেখানে বসে পিজ্জা (pizza), ওয়াইন খেলাম। প্রথমবার রোমে আসার সময়, এক জনবহুল স্থানে, এক ভিড়াকার দোকানে পিজ্জা (pizza) খেয়েছিলাম। খেয়ে চূড়ান্ত হতাশ হতে হয়েছিল।  এবার সেরকমটা হল না।  

রোমের সেন্ট্রাল স্টেশনের বেশ কাছেই। 

 ট্রেন ছাড়ল যথা সময়ে। প্রায় মাঝরাতে। ইতালিতে ট্রেনের খুব বদনাম শুনেছি। যখন তখন নাকি ক্যানসেল হয়ে যায়, বা বিলম্বিত হয় দীর্ঘ সময়ের জন্য। আমরা ভাগ্য গুণে কখনো সেরকম অবস্থায় পরিনি। ফ্লোরেন্স, পিসার মত অনেক শহর ছাড়িয়ে ট্রেন এসে বিনা বিলম্বে যখন লা স্পেৎজিয়া এসে পৌঁছালো, তখন সকাল ৬ টা বাজে।

প্রথম দিন
                                              
                                      গৃহপ্রবেশ
এই সাত সকালে স্টেশন বেশ ফাঁকাই ছিল। ইউরোপের হিসাবে মোটামুটি বড়  স্টেশন বলা চলে।  যদ্দুর মনে পড়ছে চার বা পাঁচটা প্লাটফর্ম ছিল। আমাদের ট্রেন এসে থামল তিন বা চার নম্বর প্লাটফর্ম এ।  AIRBNB তে ঘর বুক করা ছিল।  গুগল মানচিত্র খুলে দিক নির্দেশনার চেষ্টা করে বুঝলাম এক নম্বর প্লাটফর্ম পার হতে হবে।  এক নম্বর প্লাটফর্মে এসে দিখি এখানে অনেক দোকানপাট আছে। একটা পর্যটন তথ্য কেন্দ্র (Tourist Information Center) ও আছে। এখন যদিও সেটা বন্ধ।

রাস্তায় নেমে বাসস্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। হেঁটে ১৫ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। অন্তত গুগল তাই বলছে। সাথে ব্যাগ ট্রলি ইত্যাদি আছে।  তাই হয়ত আরেকটু বেশি সময় লাগবে। রাস্তাঘাট এখনো জনশূন্য।  গাড়ি ঘোড়া চলা সেভাবে শুরু হয়নি।  ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগলাম। বেশ ঘনবসতি। বাড়ি ঘর ফ্ল্যাট রেস্তোরাঁ পাব, সব মিলে মিশে এক হয়ে গেছে শহরের এই প্রাণ কেন্দ্রে।

ফুটপাতের উপরে এক জায়গায় পরপর কয়েকটা কমলালেবুর গাছ চোখে পড়ল।   ফলে ভরে  আছে গাছগুলো। কমলালেবুর মতই দেখতে। কিছু ফল মাটিতে পরে আছে।  দেখে মনে হচ্ছিল পেকে গেছে  ফলগুলো। সুগন্ধ বেরোচ্ছিল কিনা এখন আর মনে নেই।  অবাক হয়ে ভাবলাম, লোকে নিয়ে যায় নি কেন? তাহলে কি খেতে খুব টক? না কি কমলালেবু নয়, বিষাক্ত কিছু! হাতে তুলে দেখার ইচ্ছা হল। ইচ্ছা ব্যক্ত করতেই দিব্যেন্দু রে রে করে চিৎকার করে উঠল। তাই সাময়িকভাবে ইচ্ছা বিরত রাখলাম।  ভাবলাম এ পথে তো আবার আসব। এত ব্যাগপত্র তখন থাকবে না।  দেখে নোবো তখন!   

কমলালেবু না হাতি ঘোড়া কি একটা লেবুর কয়েকটা গাছ। 

আমরা প্রায় সাড়ে ছটা নাগাদ নির্ধারিত ঠিকানায় এসে পৌঁছালাম ।  খুব বেশি বাঁক ছিল না। এতে সুবিধা হল।  তা না হলে হাতে ট্রলি আর পিঠে ব্যাগ নিয়ে বারবার মোবাইলে ম্যাপ দেখা বেশ ঝামেলার। বুঝলাম, শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে এসে গেছি।  ফলে জায়গাটা শুনশান না হলেও তীব্র কোলাহল মুখর হবে না। পাঁচ বা ছয় তলার বিল্ডিংয়ে দোতলায় মালিকের এপার্টমেন্ট। পুরো বিল্ডিংটাই বেশ পুরানো আমলের বলে মনে হলো। হাল আমলে মার্বেল পাথর ও লিফ্ট বসিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। লিফ্টটা  ছিল খুবই ছোট এবং বেশ সাবেকি আমলের। আমরা দুজন আর দুটো ব্যাগ— এই নিয়েই নাকানি চোবানি খেতে হলো। লিফটের ভিতরে ঢুকে মনে হল ছোট খাঁচায় যেন দুটো আস্ত হাতিকে ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ। বা জলহস্তি কে জোর করে জাঙিয়া পরানো হচ্ছে।  এপার্টমেন্টটি ছিল দোতলায়। এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন হাসিমুখে। ইনিই বাড়ির মালকিন।

AIRBNB হয়ে এই সুবিধাটা হয়েছে। অর্থের সাশ্রয় ছাড়াও,  হোটেল বা ইয়ুথ হোস্টেলের মত নিয়ম কানুনের তীব্র জটিলতা নেই AIRBNB গুলোতে।  আমাদের যেমন ঘরের চাবি পাবার কথা দুপুর একটার পরে।  আমরা আগে থেকে জানিয়েছিলাম আমাদের অবস্থাটা। মালিক বলেছিলেন যে আমরা আমাদের জিনিসপত্র ঘরে রেখে  বেরিয়ে যেতে  পারি।  এরপর দুপুর একটার পরে যেকোন সময় এলে ঘরের চাবি উনি তুলে দেবেন।  AIRBNB তে এই অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে। এমনকি, অধিকাংশ সময়, ঘর খালি থাকলে, আগে ভাগেও ঘরের চাবি দিতে পিছপা হন না ঘরের মালিকেরা। এত সুনাম বাড়ে।  ফিডব্যাক দেবার সময় এ কথা অতিথিরা লেখে। ফলে কাস্টমার পেতে সুবিধা হয় বাড়ির মালিকদের। ইনিও হয়ত ঘরের চাবি দিয়ে দিতেন।  কিন্তু আগে থেকে লোক ছিল।  সে ঘর ছাড়বে ১১ টায়।  এরপর ঘর পরিষ্কার করে, বিছানায় নতুন চাদর পেতে, আমাদের ঘরে আমন্ত্রণ করবেন উনি।  AIRBNB তে অনেকের খারাপ অভিজ্ঞতাও হয়েছে।  সে কথা কাগজে পড়েছি। কিন্তু অদ্যাবধি আমাদের কপাল সে দিক থেকে ভালোই গেছে বলা যায়। 


একলা ঘর আমাদের বিশ্ব।  

আমরা মালপত্র দরজার পাশে রেখে, দুটো ছোটো ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে এলাম। ভদ্রমহিলা কাটাকাটি ইংরেজি এবং ফ্রেঞ্চ বলেন। ফলে কথাবার্তা বলতে বিরাট বেগ পেতে হলো না। উনি কফি খেতে আমন্ত্রণ জানালেন।  বললাম, সাত সকালে, খালি পেটে, কফি খাব না। ভদ্রমহিলা মৃদু হাসলেন।   ওনার মনের ভাব বুঝতে অসুবিধা হল না: এসব দেশে, অনেকেই,  ঘুম থেকে উঠে,  দিন শুরু করে, কালো, গাঢ়, জমাটি ,কফি খেয়ে। এতে ঘুমের জড়তা কাটে। আমরা সারারাত বিমান আর ট্রেন যাত্রা করে এসেছি।  ক্লান্ত। এখন আবার পাহাড় জঙ্গল ঘোরার  তাল করছি। তাই কফি খাবার এটাই তো আদর্শ সময়।  আমিও মনে মনে হাসলাম: খালি পেটে কেউ চা বা কফি খায় নাকিএটাকে সভ্যতার সংঘর্ষ হিসাবে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।  

                                    ভের্নাজ্জা ট্রেন যাত্রা 
যে পথে স্টেশন থেকে এসেছিলাম, সে পথেই আবার স্টেশনে ফিরলাম।  পর্যটন তথ্য কেন্দ্রটি খুলে যাবার কথা। গিয়ে দেখি খুলে গেছে। দশ চক্রে ভগবান ভূত হয়। ইতালি আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়, কিন্তু অনেক কাছের বন্ধু, যারা ইতালি বেড়াতে এসেছে বহুবার, তারা তাদের নানা খারাপ অভিজ্ঞতার কথা এমনভাবে বলেছে যে সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হয়। আসার সময়  তথ্য পর্যটন কেন্দ্রটির  খোলার সময় দেখে গেছি।  তাই অবাক হবার কিছু নেই।  তবু মনে সংশয় যদি এত সকালে না খোলে। যখন ভিতরে ঢুকলাম তখন পর্যটকের ভিড় বিশেষ ছিল না।। বড়োজোর হাতে গোনা দু চারজন। দুদিন পরে, যখন ১১ টা  নাগাদ আর একবার এসেছি, প্রায় ৪০মিনিট লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। সে কথা পরে বলব তোমাদের।


চুলবুলে লোকজন এখানেও আসে।  

কাউন্টারে ছিলেন এক মাঝবয়সী মহিলা। প্রথমেই উনি আশাভঙ্গ করলেন। এখানকার বিখ্যাত পাহাড় পথ, The Blue Path, যা পাঁচটি গ্রামকে — মন্তেরোসসো আল মারে (Monterosso al Mare)ভের্নাজ্জা (Vernazza)কর্ণিগ্লিয়া  (Corniglia)মানারোলা  (Manarola), আর  রিওমাজ্ঞীওরে  (Riomaggiore)  —  পাহাড়ের মাথা দিয়ে জুড়েছে, তার অধিকাংশটাই বন্ধ আছে। বইয়ে পড়ে এসেছিলাম যে পাহাড়ের মাথায়, এই রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করলে সমুদ্রের অপূর্ব রূপ পরিদর্শিত হয়।  এক গ্রাম ছেড়ে কখন অন্য গ্রামে লোকে পৌঁছায় তা পাহাড়ের  মাথা থেকে টের ই  পাওয়া যায় না।  মনে হল এবার সে গুড়ে বালি। এই পাঁচটা গ্রাম নিয়েই  চিঙ্কুয়ে ত্যারে— যার অর্থ পঞ্চ ভূমি।

এই পঞ্চ ভূমিই দেখতে আসা। এটাই দুগ্গা ঠাকুর। এর অধিকাংশ পথ বন্ধ  আছে শুনে মনে হল:  যে সূতো  এই পঞ্চ ভূমিকে  এক সাথে বেঁধেছে, কাঁচি দিয়ে কুচ করে কে যেন সেটা নিষ্ঠুর ছলনায়  কেটে দিয়েছে।  মনে পড়ল এক হিন্দি সিনেমার সংলাপ, যেখানে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাবনা শুনে একজন বিধায়ক বলেছিল:  আমরা কৃষক। জলের উপর নির্ভরশীল।  জল থেকে বিদ্যুৎ তুলে নিলে জলে আর থাকবে টা  কি শুনি।      

লা স্পেৎজিয়া থেকে ট্রেন ধরে গেলে প্রথমে পড়ে রিওমাজ্ঞীওরে। এর পর একে একে আসে মানারোলা, কর্ণিগ্লিয়া, ভের্নাজ্জা আর শেষে মন্তেরোসসো আল মারে। ভদ্রমহিলা জানালেন প্রথম থেকে চতুর্থ গ্রামের,  মানে রিওমাজ্ঞীওরে থেকে ভের্নাজ্জা,  যাবার রাস্তা বন্ধ। একমাত্র খোলা আছে ভের্নাজ্জা থেকে মন্তেরোসসো আল মারে। ইন্টারনেট থেকে আমরা পড়ে এসেছি যে ল্যান্ডস্লাইডের কারণে মাঝে মাঝেই The Blue Path এর  কিছু না কিছু অংশ বন্ধ থাকে। কিন্তু কয়েক বছর আগে বেশ বড়সড় আকারের ল্যান্ডস্লাইড হওয়ার  ফলে এই দীর্ঘ পথটা অকেজো হয়ে পড়েছে এবং সম্ভবত আরও বছর খানেকের আগে মেরামত কার্য সম্পূর্ণ হবে না।
ভদ্রমহিলার কাছ থেকে আরও অন্যান্য সম্ভাব্য হাইকিংএর রাস্তাগুলো জেনে নিলাম। আমরা নিজেরা পড়াশুনা করে এসেছিলাম। ওনাকে জিজ্ঞেসা করার উদ্দেশ্য— নিশ্চিত হওয়া। সাবধানের মার নেই। মাঝে মধ্যেই রাস্তাগুলো ভূমিস্খলনের (Landslide) কারণে বন্ধ থাকে। দিব্যেন্দু বার খেয়ে একটা পেল্লাই সাইজের মানচিত্র কিনে ফেললো। যদিও ভদ্রমহিলা, বিনামূল্যে, ছোট আকারের একটা মানচিত্র দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে, আমার প্রত্যাশা মতোই দেখব,  দিব্যেন্দুর কেনা মানচিত্র অক্ষত অবস্থায়, বা বলা ভালো ব্যাগস্থ অবস্থায়, ফিরে গেলো ফিনল্যান্ডে।

আমরা এক দিনের জন্য "চিঙ্কুয়ে ত্যারে কার্ড" কিনলাম। এই কার্ডটা থাকলে, লা স্পেৎজিয়া থেকে চিঙ্কুয়ে ত্যারে পার হয়ে লেভান্তো (Levanto) পর্যন্ত, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে, যতখুশি যাতায়াত করা যাবে। এছাড়া, The Blue Path এর যে অংশটা খোলা আছে সেখানে যেতেও আলাদা করে আর টিকিট কাটতে হবে না। মাথা পিছু দাম পড়লো ১৬ ইউরো মতো।

পর্যটন তথ্য কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ঠিক হল প্রথমে ভের্নাজ্জা যাওয়া হবে ট্রেন ধরে। তারপর, The Blue Path এর যে অংশটা খোলা আছে, সেই পথ ধরে, পাহাড়ের মাথা দিয়ে, যাব মন্তেরোসসো আল মারে তে ।  তারপর দেখব শরীরে কত  শক্তি অবশিষ্ট আছে। সেইমত ঠিক হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।  বিমান আর ট্রেন যাত্রা র ধকল আছে।  সারারাত ট্রেনে বসে এসেছি।  প্রায় দু বছরের উপর হয়ে গেছে, সে ভাবে হাইকিং করিনি।  ফলে কতটা দম থাকবে বলা শক্ত। ট্রেন যাত্রা শুরুর আগে, লা স্পেৎজিয়া স্টেশনে, আমরা এক কাপ করে কফি আর একটু কেক, পেস্ট্রি খেয়ে নিলাম। ভের্নাজ্জার আগে ট্রেন একে একে আগের সবকটি গ্রামে থামলো। ট্রেন যাত্রাপথটি চমকপ্রদ। লা স্পেৎজিয়া থেকে রিওমাজ্ঞীওরে, বেশিরভাগ যাত্রাপথটাই সুড়ঙ্গের  ভিতর দিয়ে। আড়াআড়ি ভাবে, পাহাড়ের পেট কেটে, তৈরি হয়েছে সুড়ঙ্গ। রিওমাজ্ঞীওরের পর থেকেই, মাঝে মাঝে সমুদ্র সুড়ঙ্গের গর্তে গিয়ে ঢোকে। আর গর্ত থেকে বের হলেই, বাঁদিকে, দেখা যায় নীল সমুদ্র।  সে এক অদ্ভুত  লুকোচুরি খেলা।


নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়: ট্রেন থেকে নেওয়া সমুদ্রের ছবি।       


ভের্নাজ্জাতে নেমে দেখি, এখানেও, ট্রেন স্টেশনে, রয়েছে একটা পর্যটন তথ্য কেন্দ্র। প্রথমে কাউন্টারে কেউ ছিল না। মিনিট দশেক পরে এক ভদ্রলোক এলেন কাউন্টারে। বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না : এনাকে  জিজ্ঞাসা করলাম The Blue Path এর বাকি পথগুলো সত্যি বন্ধ আছে কিনা! ইনিও,  লা স্পেৎজিয়া তে যা শুনে এসেছি তার পুনরাবৃত্তি করলেন: এখানথেকে কেবলমাত্র মন্তেরোসসো আল মারে তে যাওয়া যাবে। এনার কাছে জেনে নিলাম The Blue Path এর যাত্রামুখের  শুরুটা  কোন দিকে।

 শহরের মধ্যে দিয়ে মিনিট পাঁচেক যাবার পরেই The Blue Path এর ল্যাজে এসে পড়লাম। এবার লক্ষ্য ল্যাজ থেকে মুড়োর দিকে যাওয়া।  যদিও জানি রাস্তা খারাপ থাকার কারণে পেটে গিয়ে নেমে পড়তে হবে। এই সাতসকালে শুরু করার কারণে দেখলাম যে চেক ইন পয়েন্টে কোনো লোকই নেই। আমরা প্রায় ঘন্টা দেড় দুই  পরে, যখন মন্তেরোসসো আল মারের কাছে পৌছালাম, দেখি ওদিকের চেক ইন পয়েন্টে, একটা লোক বসে বসে সবার টিকিট পরীক্ষা করছে। যথারীতি লম্বা লাইনও পড়েছে। সে কথা পরে বলব।    

প্রথম হাইকিং, ভের্নাজ্জা থেকে মন্তেরোসসো আল মারে, প্রায় দু ঘন্টা
হাইকিং আমরা আগেও করেছি, কখনও বন্ধুদের সাথে, কখনও বা একাকী। কিন্তু এত সকালে হাইকিং শুরু করবার কোনো স্মৃতি আমাদের নেই বললেই চলে। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। বাতাসে আদ্রতা ছিল না বললেই চলে। এক সপ্তাহ আগে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে, বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা  বলছিল। বৃষ্টি হয়নি— কথায় বলে রাখে হরি তো মারে কে!  যাত্রাশুরুর প্রায় ৫ মিনিটের মধ্যেই মন ভরে গেলো, বা বলা ভাল, ভরা মনে আরো এক পলকা খুশির হাওয়া খেলে গেল, প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। বাঁয়ে সমুদ্র পাহাড়ের পায়ে নিরন্তর সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। নীল জল, নীল আকাশ। সূর্যের এমন আলো আর এমন আদর্শ তাপমাত্রা— সবমিলে যেন এক হরগৌরীর মিলন উৎসব আয়োজিত হয়েছিল প্রকৃতির বুকে।


আমাদের এই হ্যাংলামি তোমরা হয়তো সবাই বুঝবে না— ফিনল্যান্ডে ঠান্ডার দৌরাত্ম্য শুরু হয়ে যায় সেপ্টেম্বর মাস থেকে। কখনো বা মাসের পর মাস সূর্য ওঠে না। দিন রাত এক হয়ে যায়। মানুষকে করে তোলে অসূর্যস্পশ্যা। তাই এমন টকটকে সতেজ সূর্য, সাথে সমুদ্রের নীল জল, পাহাড়ের গায়ে গজিয়ে ওঠা পত্রপুষ্পলতা— সব মিলে, আমাদের মনে, প্রথমেই একরাশ খুশির উদ্দীপনা এসে ঝাপ্টা দিলো। যাত্রাপথ আর সমুদ্রের মাঝে কখনও কখনও  ছোটো ছোটো বাগান চোখে পড়লো। সেগুলোই হয়তো আঙ্গুর বা অলিভের বাগান। সব দেখে শুনে মনে হল, এই যাত্রাপথটিকে নিয়মিত ভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা হয়, যাতে আবালবৃদ্ধবনিতা কেউ এর রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত না হয়।

সুরক্ষার কথা ভেবে, কিছু কিছু জায়গাতে, সমুদ্রের ধার বরাবর, রেলিং দেওয়া ছিল। মাঝে মাঝে সমুদ্র হারিয়ে যায় পথের আর জঙ্গলের বাঁকে।  তারপর, আবার কখন দুম করে চলে আসে নজরের আওতায়। কিছু কিছু জায়গা বেশ সংকীর্ণ। এই সংকীর্ণতা বাদ দিলে, যাত্রাপথে আলাদা কোনো শঙ্কার কারণ ছিল না।


আমরা যেমন ভের্নাজ্জা থেকে মন্তেরোসসো আল মারে অভিমুখে যাচ্ছিলাম, অনেকে আবার উল্টোপথে আসছিলো, মন্তেরোসসো আল মারে থেকে ভের্নাজ্জা অভিমুখে । রাস্তার সংকীর্ণতার কারণে, প্রায়শই, একজনকে অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায় দাঁড়িয়ে, উল্টো অভিমুখে আসা আর একজনের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিতে হচ্ছিল। যার ফলে চলার গতি বেশ খানিকটা মন্থর হচ্ছিল। পর্যটকদের মধ্যে, প্রত্যাশিত ভাবেই, একটা বড় অংশ ছিল ফ্রেঞ্চ। আবার এই ফ্রেঞ্চদের একটা বড় অংশই বেশ বয়স্ক। ৬০-৮০ কোনো কিছুই বাদ নেই। এদের অনেকেই  সঙ্গে করে  সাধের কুকুর নিয়ে এসেছে। শুনেছি মে, জুন মাস থেকে শুরু করে অগাস্ট, সেপ্টম্বর পর্যন্ত প্রচন্ড ভিড় থাকে এখানে। সে সময় মানুষের চলার গতি স্বাভাবিক ভাবেই আরও মন্দীভূত হয়।

যাত্রাপথের মাঝে মাঝেই কোথা থেকে সব ছোট ছোট ঝর্ণার আবির্ভাব হতে লাগল। অধিকাংশই সরু নালার মত। জলাভাবে নিজেদের ঝর্ণার পদমর্যাদা ধরে রাখতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে তারা। আর দেখতে পেলাম রংবেরঙের ফুল। কি বাহার তাদের! গোলাপি থেকে শুরু করে হলুদ, বেগুনি, লাল— কি রং নেই সেখানে! স্বযত্নে কেউ যেন ফুলরাশিকে লালন পালন করে চলেছে। আর ছিল অগণিত তক্ষক। বেশিরভাগই ছানা তক্ষক।


কি ফুল কে জানে? 
ঘন্টা দেড়েক এইভাবে চলার পরে একটা চেক পয়েন্ট আর লোকের জটলা চোখে পড়ল। বুঝলাম যে মন্তেরোসসো আল মারে এসে পড়েছি। যারা মন্তেরোসসো আল মারে থেকে ভের্নাজ্জা যাবে তারা টিকিট কাটছে। যাদের টিকিট কাটা আছে আগেভাগে, তারা টিকিট পরীক্ষা করাচ্ছে। আগে জানতাম না যে যে এই চেকইন পয়েন্ট গুলো থেকেও টিকিট কাটা যায়।

এখানে একটা মজার কথা বলি। চেক পয়েন্টে পৌঁছানোর মিনিট ৫-১০ আগে, ফ্রক আর চপ্পল পায়ে বেশ কয়েকজন রমণীর দেখা মিললো। এমন জুতো জামা পরে কেউ যে পাহাড় পরিক্রমা করতে পারে তা দেখে বেশ ভাল লাগল। আমার বছর চারেক আগের একটা ঘটনার কথা মনে পরে গেল। তখন আমি বেশ আনাড়ি। ইউরোপে, প্রথম কোথাও বেড়াতে গেছি সেই অর্থে—  ফ্রান্সের  সামনি (Chamonix) তে। পাহাড়, বরফের জায়গা। কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে, সোজা চপ্পল পরে, একদিন ঢুকেছিলাম বরফের গুহায়। লোকে পাহাড়ের গুহা দেখবে না আমাকে দেখবে সেই নিয়েই হুলুস তুলুস পরে গিয়েছিল।

সে যাই হোক, আমরা চেক পয়েন্টে বসে থাকা ভদ্রলোকের কাছে লেভান্তো যাবার রাস্তাটা জেনে নিলাম। মাত্র দেড় দু ঘন্টা হাইকিং এ পোষাবে না। উনি একটা ছোট ম্যাপ দিলেন। আর মুখে বলে দিলেন কিভাবে যেতে হবে। প্রথমে পাহাড় পেরিয়ে শহরে নামতে হবে।  তারপর শহরের অন্যদিক দিয়ে শুরু হবে যাত্রা।  চেক পয়েন্ট থেকে শহরে নামতে আধঘন্টার কমই লাগলো।

সমুদ্রতলে পা রাখবার পাঁচ দশ মিনিট আগে একটা কালো বিড়ালের দেখা মিললো। মনে হলো কোনো বাড়ির পোষা বিড়াল ফাঁক পেয়ে বাড়ি ছেড়ে এ পাঁচিল ও পাঁচিল করে বেড়াচ্ছে। তারপরে, প্রাচীরের এক জায়গায় বসে, ঘাপটি মেরে ঝোঁপের দিকে চেয়ে ইঁদুর জাতীয় কোনো প্রাণীর প্রতীক্ষা করতে লাগলো। বিড়ালের ইঁদুর শিকারের দৃশ্য কল্পনা করে আমরা কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে গেলাম।  বিনা পয়সায় এসব দেখার সৌভাগ্য তো আর চট করে হয় না। বিড়াল বাবাজি, নানা কায়দায় পোজ দিয়ে, এদিকে ওদিকে সরে গিয়ে, অদৃশ্য শিকারকে তাক করতে লাগল।  প্রায় দশ মিনিট নাচন কোঁদন করে, কিছু না পেয়ে, আমাদের দিকে বড়  বড়  চোখ করে, জোড়ে জোড়ে মেউ মেউ করে, নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করল। ভাবটা এমন, যেন বিড়াল নয় বাঘ।


কালো বিড়াল।

                                       
                                           গ্রাম ভের্নাজ্জা
সমুদ্রতলে নেমে এসে মনটা নতুন করে ভরে গেল। দেখি বিস্তীর্ণ  হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের নীল জলে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। বহু মানুষ জমা হয়েছে সমুদ্র সৈকতে। কেউ চিৎ হয়ে, কেউ উপুড় হয়ে সূর্যস্নান করছে। দু একটা ব্যতিক্রমী ছাড়া জলে কেউই নামে নি। সমুদ্রতল থেকে পাহাড়ের দিকে চেয়ে মনটা আরও সঞ্জীবিত হয়ে উঠলো। উপলব্ধি করতে পারলাম কতটা পথ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। সমুদ্রতলে নেমে আমরা দ্বিধায় পড়লাম। আমাদের কি করা উচিত— সমুদ্র সৈকতে বসে সূর্যালোকে স্নাত হওয়া, না লেভান্তো অভিমুখে হাইকিংয়ের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করা? কিছু দ্বিধা দ্বন্ধের পর, আলাপ আলোচনা শেষে, দ্বিতীয় প্রস্তাবনাটাই জয়ী হল।


এখানেই বসে যাব ? না এগিয়ে যাব?   


প্রথমে শহরের মাঝখান দিয়ে কিছুটা হাঁটতে হবে। তারপর, পাহাড়পথের মুখে পৌঁছে শহরকে বিদায়। শহরের মাঝে চলতে চলতে আমরা একটা খোলা বাজারে এসে পৌঁছালাম। বেশ জমজমাট ব্যাপার। দেশ বিদেশ থেকে লোক এসেছে। চাইনিজ, জাপানিজ, আফ্রিকান, ইউরোপিয়ান, ভারতীয়— কে নেই সেখানে! অনেক রকমের খাবার দাবার, পানীয় থেকে শুরু করে ফলমূল, শাক সবজি, প্রায় সব কিছুই বিক্রি হচ্ছিল— একদম হীরে থেকে জিরে, সব। বেশ সস্তায় বিক্রি হচ্ছিল স্থানীয় ওয়াইন। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে তিনটি ওয়াইন এর বোতল। এখন ব্যাগ ভারী করে কেনাকাটা সম্ভব নয়। বহু পথ হাঁটতে হবে। তাই, মিনিট দশেক বাজারটাকে চোখ বুলিয়ে, পরবর্তীতে কি কি কেনা বা খাওয়া যেতে পারে তার একটা তালিকা মনে মনে তৈরী করে, এগিয়ে চললাম। মিটার পঞ্চাশ এগিয়ে দেখি, সমুদ্র সৈকতের ধারে, বেশ কিছু দোকান আছে। খোলা বাজারের মত এদিকটাও বেশ জমজমাট।  

ইতালি আসার অন্যতম কারণ থাকে এখানকার খাবারদাবার। এতটা হাঁটাহাঁটি করে মনে হল এই তো সুবর্ণ সুযোগ, খাদ্যযজ্ঞে সামিল হবার। ভরপুর খাবার সময় যদিও এটা নয়। অনেক পথ হাঁটা বাকি।  তবে একটু ওয়ার্মআপ করা যেতেই  পারে।  দেখলাম এখানে ফোকাশিও (Foccasio) রয়েছে।  এর কথা অনেক শুনে এসেছি। এটি বিশেষ এক ধরণের পাঁউরুটি বলা যায়। কাবলি ছোলা থেকে তৈরী হয় পাঁউরুটির ময়দা। এছাড়া এর মধ্যে থাকে অলিভ অয়েল আর রোজমেরি গাছের পাতা। অন্যকিছুর সাথে যেমন এই পাঁউরুটি খাওয়া হয় তেমনি স্ন্যাক হিসেবে শুধুও খাওয়া যেতে পারে। আমরা শুধুই খেলাম। বেশ অন্য এক ধরণের স্বাদ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন নতুন, নামকরা খাবারে, অনেক সময় অপ্রীতিকর চমক থাক। দু বছর আগে ইতালির নেপেলসেই মনে আছে, সকালে কেক খেতে গিয়ে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটেছিল। সুদর্শন কেকবাজিকে যেই কামড় দিয়েছি, দেখি ভিতরে রাম না হুইস্কি কি যেন ভরা ছিল। সাত সকালে, খালি পেটে, এসব ছ্যাবলামি কার আর ভাল লাগে? ভাগ্য গুনে এক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেনি। আমাদের বেশ ভালো লাগল ফোকাশিও— এবং সেটা শুধু খিদের কারণে নয়। দু বোতল পানীয় জল তুলে নিলাম এখানে। আবার নতুন করে পাহাড় পরিক্রমা শুরু করতে হবে।


ফোকাশিও

এরপর, সমুদ্রকে বামদিকে রেখে এগিয়ে চললাম। ডানদিকে একটা পর্যটন তথ্য কেন্দ্র  পড়ল। সেখান থেকে যাত্রাপথের অভিমুখ আর একবার জেনে নিলাম। দু চার পা হাঁটার পরেই এখানকার বিখ্যাত সব জিলাতো (Gelato) র দোকান চোখে পড়লো। আমরা দুজনেই, ছোটো কোনে, দু রকমের আলাদা স্বাদের জিলাতো নিলাম । এই সবে শুরু, এরপর যে  চার পাঁচদিন ইতালিতে আমরা কাটিয়েছি, বিভিন্ন দোকান থেকে, কত বার যে ভিন্ন স্বাদের জিলাতো ভক্ষণ করেছি, তা বোধ হয় আমাদের হিসাবের মধ্যে আর নেই। সাদামাটা ভাবে বলতে গেলে জিলাতো হল আইসক্রিম। ইতালিতে আইসক্রিম আগেও খেয়েছি। উচ্চমানের সব আইসক্রিম। কত বিভিন্ন স্বাদের এবং তাদের  কি সব রূপলাবণ্য (Texture) । অন্য কোনো দেশে, এত বাহারের আইসক্রিম, পাওয়া যায় বলে মনে হয় না।


দ্বিতীয় হাইকিং, মন্তেরোসসো আল মারে থেকে লেভান্তো, প্রায় তিন ঘন্টা
এরপর, পূর্ণ উদ্দ্যমে হাইকিং পর্ব শুরু হলো।
এখান থেকে দেখি, পদব্রজে, পাহাড় ডিঙিয়ে, যাবার রাস্তাগুলোর দিক বেশ ভালোভাবেই নির্দেশিত আছে। তাই, এখন থেকে আর লোকজনকে ঘন ঘন জিজ্ঞাসাবাদ করতে হল না।  প্রথম ১৫-২০ মিনিট  সড়ক পথে উপরে উঠতে লাগলাম। চারিদিকে বাড়িঘর সব চোখে পড়তে লাগলো। বেশিরভাগ সড়ক পথটাই বেশ অপ্রশস্থ বলা চলে। তার উপরে বিরাট বিরাট বাঁক। ড্রাইভারদের সুবিধার জন্য, বাঁকের মুখে, কায়দা করে, আয়না বসানো ছিল, যাতে উল্টো দিক থেকে আসা পদচারী বা গাড়িঘোড়ার প্রতিবিম্ব সহজেই দেখা যায়। উল্টোদিক থেকে অনেকেই হাইকিং করে ফিরছিল। নিশ্চিত হবার জন্যে একজনকে জিজ্ঞসা করলাম এই পথটাই লেভান্তো নিয়ে যাবে কিনা? ভদ্রমহিলা বললেন হ্যাঁ— তবে বহু দূর

দিব্যেন্দু এতক্ষন অবধি ফুলপ্যান্ট আর ফুলশার্ট পরে "বাবু" সেজে ছিল। ওর গরম একটু কম লাগে। কানপুর আই আই টি তে প্রায় ছয় বছর ছিল। উত্তর ভারতে গরমকালে, মে জুন মাসে, তাপমাত্রা মাঝে  মাঝে প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই  ছুঁই করে।  ঐ প্রচন্ড গরমে, ঘুমানোর সময়, মহাশয় যখন পাখা চালাত, রেগুলেটর থাকত পাঁচের বদলে তিনে। বিয়ের আগে, গ্রেনবল শহরে ছিল প্রায় তিন বছর।  ওখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা মাঝে মাঝে চল্লিশ ছোঁয়।  ওর কাছে কোন পাখা থাকত  না। 

এখন অবস্থা মনে হয় কিছুটা পাল্টেছে। মানুষ অভ্যেসের দাস। ঠান্ডার দেশে এতদিন থেকে গরমে একটু কাবু হওয়া স্বাভাবিক। আকাশে সূর্যের তেজ বেড়েছে। তারপর পাহাড়ে হাঁটার কষ্ট তো আছেই। ওর জামা কাপড় দেখে আমিই হাঁসফাঁস করা শুরু করলাম। ব্যাগে সাঁতারের প্যান্ট ছিল— যদি সমুদ্রে নামি কথা ভেবে নিয়ে আসা। ওটাই পড়ে ফেললো।


অনেক পথ যাবার আছে বাকি। 

সড়ক রাস্তা শেষ হয়ে জঙ্গলপথ শুরু হল। শুরু হল খাড়া পথ। আগের হাইকিং টা, The Blue Path, ছিল অধিকাংশই কৃত্রিম পথে। এখানকার প্রায় সবটাই পাহাড়ি জঙ্গল পথ, মানুষের পায়ে পায়ে স্বাভাবিক ভাবে গড়ে উঠেছে। The Blue Path এর চেয়ে বেশ খানিকটা চ্যালেঞ্জিং, অনেকবেশি রোমাঞ্চকর ও বৈচিত্রময়। ফুলের বৈচিত্র যেন আরো অনেক বেশি। মাঝে মাঝে পাহাড়ি তে মাথা বা চার মাথার মোড় এসে পড়ছিল। তীরচিহ্ন সহ বিভিন্ন জায়গার দিক নির্দেশিত ছিল সেখানে। বুঝলাম, শুধু লেভান্তো নয়, চাইলে আরও অনেক জায়গাতেই এখান থেকে হাইকিং করা সম্ভব।  

ফুলের বাহার ছিল।  

রয়েছে বেশ কিছু চওড়া অধিত্যকা বা মালভূমি (plateau) মত জায়গা। অনেক স্কুল, কলেজের ছাত্র ছাত্রীর দল চোখে পড়লো। ওরা নিজেদের মধ্যে মজমস্তি করছে। খুনসুটি করছে। অনেকে আবার মাইক বাজিয়ে উচ্চস্বরে গান বাজনা শুনছে। নাচছে। ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে বাবা মা চড়ুইভাতি করছে। The Blue Path এ  বাচ্ছা ঘাড়ে অনেক বাবা মা কে দেখা গিয়েছিলো। এ যাত্রায় খুব বেশি চোখে পড়লো না। খুব বেশি বয়স্ক মানুষ ও চোখে পড়ল না।

এখানে বড় বড় গাছের সংখ্যা অনেক বেশি। বেশ কিছু জায়গায়, পথের দু পাশে, রয়েছে অজস্র ওক গাছ। গাছের ডালপালা, চাঁদোয়ার মতো, সূর্যালোককে ঢেকে দিয়ে, আবছায়াময় পাহাড় পথে, এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কোথাও সমুদ্র মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আমরা পৃথিবীতে আছি। আবার কখনো পাহাড় পথ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কি প্রমান করতে চাইছে সেই জানে!


লেভান্তোর পথে।  

এক দেড় ঘন্টা চলার পরে এক  দ্রষ্টব্য স্থল (view point) এল। একটা পরিত্যক্ত বাড়ির মত পড়ে ছিল। পাহাড়ের বক্ষদেশে, যেখানে গাড়ি ঘোড়া আসা অসম্ভব, সেখানে হঠাৎ করে এই বাড়ি নির্মাণ কি করে সম্ভব, তা ভেবে বেশ বিস্ময় লাগলো। আমার মেয়েবেলায় পড়া অনেক ভূতুড়ে বা গোয়েন্দা গল্পের মত  সে বাড়ি। এর বিশেষত্ব কি, কেন এমন ঘটা করে রীতিমতন নামকরণ করে  এটিকে বিশেষ পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে ও পর্যটকদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে  এটিকে দেখার জন্য, তা ঠিক বুঝলাম না।  বেড়াতে বেরিয়ে এমন হয়। বহুবার বিশেষ অট্টালিকা দেখেছি।  কিন্তু কেন যে সে বিখ্যাত, আমাদের গ্রামের বাসু মল্লিক বা ঘোষ পারার নাড়ু ঘোষের বাড়ির থেকে কেন আলাদা সে সব ঠাউরে উঠতে পারি নি। নিজের অপটু চোখ বা ইতিহাসের নির্যাসের স্বাদ গ্রহণে অপারক নিজের অশিক্ষিত জিভকে দায়ী করা ছাড়া অন্য  কোন উপায় নেই।   বাড়ির কাছে একদল ফরাসি যাত্রী চড়ুইভাতি করছিল। প্রায় সকলেই পঞ্চাশোর্ধ। পায়ের গোছা দেখেই বোঝা যায়, সকলেই  বেশ খেলুড়ে। ভাঙা বাড়ি পরিত্যাগ করে আবার মূল যাত্রাপথের দিকে ফিরে এলাম।


কিছুদূর যাবার পরে এক জার্মান পরিবারের সাথে দেখা হল — স্বামী, স্ত্রী আর দুই বাচ্চা। ওনাদের ক্যামেরাটা এগিয়ে দিয়ে পুরো পরিবারের জন্য ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করলেন। ওনাদের দাবি মিটিয়ে আমরাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। মোবাইলের সেলফি সব সময় পোষায় না। অন্যান্য পর্যটকদের অনুরোধ করতে হয়। বেশি লজ্জা ফজ্জা করলে চলে না। প্রায় নিজেদের অজান্তেই কখন যেন আস্তে আস্তে নিচের দিকে নাম শুরু করলাম।  পাহাড়ের মাথা পেরিয়ে গেছি। উল্টোদিক দিয়ে সমুদ্রতলে ফেরা র পালা এবার।  সব পাহাড়ের মাথা সরু, সূঁচালো হয় না।  মাথা মোটা পাহাড় ও হয়।  এ যেন অনেকটা সেরকম। আমাদের গতি ত্বরান্বিত হল। হাঁটুর উপরে চাপও বাড়তে লাগল—পাহাড় থেকে নামার চির পরিচিত অভিজ্ঞতা। প্রায় তিনঘন্টার আগেই লেভান্তো এসে পৌঁছালাম।                           

                               
 সন্ধ্যায় রিওমাজ্ঞীওরে
লেভান্তো থেকে ট্রেন ধরে ঘরে ফিরলাম।  মহিলা আমাদের ঘরের চাবি হস্তান্তরিত করলেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো ঘর। রান্নাঘরটা দেখিয়ে দিলেন। বেশ সাজানো, যদিও বাড়ির সবার সাথে শেয়ার করতে হবে। সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল। খাওয়া দাওয়া করলাম বাড়িতেই। ডিম, আলুভাতে, ভাত।  ডিনার শেষে, আবার আমরা রিওমাজ্ঞীওরে গেলাম। এক সামুদ্রিক মাছের দোকানের কথা ইন্টারনেটে পড়ে এসেছিলাম।  সেটা আবিষ্কার করলাম। দেখলাম, সামুদ্রিক মাছ ও আরো কি সব ভাজা বিক্রি হচ্ছে শঙ্কু আকারের ঠোঙাতে। অনেকে তা সানন্দে ভক্ষণ করছে লাইনে দাঁড়িয়ে।  লাইন এর ভিড় ও যথেষ্ট। 


দেখো দেখো কি সব বিক্রি হচ্ছে। 

বাড়ি থেকেই পেট ভর্তি খাবার খেয়ে এসেছি। আমাদের এদিনের কোটায় মাছভাজা ছিল না। আমরা জিলাতোর সন্ধানে বের হলাম। অনেকগুলো জিলাতোর দোকান চোখে পড়লো কিন্তু রূপ, গুণ অথবা বৈভবের কারণে ঠিক পোষালো না। হাল ছেড়ে দেব দেব করছি, এমন সময় সমুদ্রের ধারে একটি দোকানে ভীড় চোখে পড়ল। তখন প্রায় রাত ৯.৩০টা ১০ টা হবে। ওখান থেকে তিনটি করে বিভিন্ন স্বাদের জিলাতো তুলে নিয়ে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে লা স্পেৎজিয়া ফিরে এলাম।

দ্বিতীয় দিন


                                      ফেরীতে হেরাফেরি 
পরের দিন সকালে উঠতে একটু দেরি হল। আগের দু তিন রাত, এমনিতেই ঘুম কম হয়েছে। তার উপরে অনেক দিন পর লম্বা হাইকিংয়ের ধকল। আজকে ইচ্ছা পালমারিয়া (Palmaria) দ্বীপে যাওয়া। ওখানে পাহাড় আছে।  হাইকিং ও হয়ে যাবে।  তারপর পোর্তো ভেনেরে  ঘোরা।  পালমারিয়া দ্বীপ পোর্তো ভেনেরে (Porto Venere)  থেকে খুব কাছে। পরিকল্পনা মত, প্রথমে লা স্পেৎজিয়া ফেরী ঘাটে গেলাম। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম, পালমারিয়া দ্বীপে, কোন ফেরী সরাসরি যাবে না। ফেরী পোর্তো ভেনেরে  যাবে। ওখান থেকে পালমারিয়া দ্বীপের জন্য আলাদা করে ছোট ফেরী ছাড়বে।

বাসে করে পোর্তো ভেনেরে  গেলে অনেকটা  সস্তা হবে জানতাম। কিন্তু সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। এখান  থেকে আবার বাসস্টপ যাওয়া। ছুটির সময় বাসের সংখ্যা এমনিতেই কমে যায়। তাই ফেরীতে যাওয়াই মনস্থ করলাম। এক দিকের জন্য দুজনের ৮+৮ করে ১৬ ইউরো পড়লো। কোন দিকে ফিরবো বা পরবর্তীতে কি করবো ঠিক ছিল না। তাই ফেরার টিকিট আর কাটলাম না। তা না হলে রিটার্ন টিকিটের দাম ১৩ ইউরো মাথাপিছু।



ফেরীতে তিল ধরণের জায়গা ছিল না। আমরা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে ফেরী মাঝ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললো। এই খানে সমুদ্র খুব একটা চওড়া নয়। পোর্তো ভেনেরে, লা স্পেৎজিয়া আর সান তেরেঞ্জো (San Terenzo)— এই তিনটে শহরকে, সমুদ্রাংশ, উল্টো-U  আকার দান  করেছে। এই  উল্টো-U   এর মাথায় অবস্থিত লা স্পেৎজিয়া। বাঁ পায়ে পোর্তো ভেনেরে আর ডান পায়ে সান তেরেঞ্জো।


  পোর্তো ভেনেরের পথে আকাশ আর সমুদ্রের কানাকানি। 

পোর্তো ভেনেরে ঢোকার মুখেই, উল্টোদিকে, একটা দ্বীপ চোখে পড়লো। মনে হল এটা পালমারিয়া হলেও হতে পারে। আমাদের মতো অনেকেই এখানে নেমে গেলো। অনেকে ফেরীতে রয়ে গেলো। আবার অনেকে, এখানে, ফেরীতে এসে যোগদান করলো। এবার এদেরকে নিয়ে চিঙ্কুয়ে ত্যারে র উদ্দেশ্যে রওনা দেবে ফেরিটা।  


ফেরী থেকে নেমে আমরা পালমারিয়া যাবার উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলাম।  একজন টিকিট কাউন্টারের সন্ধান দিল। সেখানে খোঁজ খবর করতে জানা গেল পালমারিয়া যাবার ফেরী শিগ্রই ছাড়বে। পালমারিয়া থেকে খুবই কাছে আরও দুটি ছোট ছোট দ্বীপ আছে। তিনো  (Tino) আর তিনেত্তো (Tinetto) বলে। ও দুটোতেই কারোর নামার অধিকার নেই— মিলিটারির কি সব গোপন কাজকর্ম চলে ওখানে। তবে দ্বীপ দুটির চারপাশে নৌকা বিহার করা যায়। তিনটি দ্বীপে ও একটা গুহায় নৌকা বিহার করলে তার মূল্য ১২ ইউরো মতো। আমাদের লক্ষ্য ছিল হাইকিং। তাই পালমারিয়া আসা যাবার টিকিট কেটে নিলাম। দাম পড়লো মাথাপিছু ৫ ইউরো করে। পালমারিয়া যাবার ফেরীটা ছিল বেশ ছোট। এটাকে  ছোট নৌকা বা খেয়া বলা যায়। পোর্তো ভেনেরের দক্ষিণে পালমারিয়া। মানচিত্র দেখলে মনে হয় তামিলনাড়ু আর শ্রীলঙ্কা যেন। যদিও মাত্র দশ মিনিট লাগে নৌকায় যেতে। পালমারিয়ার দক্ষিণে তিনো  আর তার দক্ষিণে তিনেত্তো।  জনা বিশেক যাত্রী নিয়ে নৌকা যখন ভিড়ল পালমারিয়ার ঘাটে, তখন সাড়ে তিনটে বাজে। 


          পালমারিয়া দ্বীপ: আবার হাইকিং, প্রায় তিন ঘন্টা   
পালমারিয়া এই অঞ্চলের সবথেকে বড় দ্বীপ। দুই বর্গ কিলোমিটার ক্ষেত্র জুড়ে অবস্থিত। চিরস্থায়ী ভাবে বোধ হয় কেউই বসবাস করে না। তা সে যাই  হোক, এবার আমাদের হাইকিং শুরু করতে হবে। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার রাস্তা। সামনেই একটা ছোটোখাটো দোকান মতো খোলা ছিল। খাবারের দোকান। সঙ্গে খাবার কিছুই নিয়ে আসা হয়নি। এখন বিরাট কিছু খিদে পায়নি হয়ত। কিন্তু ঘন্টাখানেক হাইকিং করার পরে, যেখান সেখান থেকে, চোঁ চোঁ করে খিদে উড়ে আসবে। পাহাড় অরণ্যের মাঝখানে খাবার দাবার পাওয়া অসম্ভব। দোকানে গিয়ে খাবার দাবার তালাশ করলাম। জিনিসের দাম আর যা যা পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে বুঝলাম আমাদের একটা মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। কিছু খাবার দাবার ব্যাগভর্তি করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। যাই হোক, মনোবেদনা চেপে, বাজার দামের প্রায় তিন গুন বেশি দামে, দুজনের জন্য দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ তুলে নিলাম। পরবর্তী কালে, ঘন্টা তিনেক বাদে, প্রবল খিদের মুখে যখন কামড় দিয়েছিলাম এই তথাকথিত চিকেন স্যান্ডউইচে, মনে হচ্ছিল যেন চিকেন বাবাজি জ্যান্ত হয়ে উঠে আমাদের সামনে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাঁসছে আর বলছে, "কি আর খাবি আমায়?"

পালমারিয়া পৌঁছে।  

ওই দোকানেই, হাইকিং এর রাস্তাটা জেনে নিলাম। নির্দেশিত পথে, খানিকটা এগোতেই আবার সমুদ্রের কাছাকাছি এসে পড়লাম। ছোট দ্বীপের এই মজা। এখান থেকে পোর্তো ভেনেরের বিখ্যাত কাথিড্রালটা চোখে পড়লো। ঠিক করলাম ফেরার পথে একবার দর্শন দিয়ে যাবো। এখান আর পোর্তো ভেনেরের মাঝের সমুদ্র বেশ অপ্রশস্ত। বড় জোড় চার পাঁচশ মিটার হবে। পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। পাহাড় পথটা অধিকাংশই ছিল বেশ খাড়া। প্রথম আধঘন্টা  কোনো লোকজন চোখে পড়লো না। দুদিকে ঝোপঝাড়, গাছপালার জঙ্গল আর মাঝখান দিয়ে খাড়া, বড় বড় পাথুরে বা শিলার রাস্তা। হাইকিং স্টিক সঙ্গে নেই। ফিনল্যাণ্ড থেকে একটা নিয়ে এসেছিলাম বটে, তবে আগেরদিন, হাইকিং শুরুর আগেই, ট্রেনে বা কফি খাবার সময় কোথাও ফেলে চলে এসেছি— এখন হঠাৎ মনে পড়ল।  অনেক জায়গাতেই পথ বেশ খাড়া— দু হাত ব্যবহার করতে হল।


পালমারিয়া থেকে পোর্তো ভেনেরে।   

এবার কয়েকজন লোকের দেখা পেলাম। এরা  নিচে  নামছিলো। আরো কিছুক্ষন উপরে ওঠার পরে, এক ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হলো।  উনি ইতালিরই বাসিন্দা। এখানে বেশ কয়েকবার এসেছেন। বছর পঞ্চাশ বয়স হবে। উনি ধীর পায়ে নিজের মনে উপরে উঠছিলেন। এনার সাথে, মিনিট পাঁচেক চলার পরে, একটা পরিত্যক্ত, প্রাচীন, জমিদার বাড়ির মত অট্টালিকা চোখে পড়ল। বাইরে লোহার গেট। ভিতর থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এলো। মহিলাটি ইতালিয়ান ভাষায় ওদের সাথে কিছু কথাবার্তা বললেন। তারপর, ওদের মধ্যে, যা কথাবার্তা হলো ইতালিয়ান ভাষায়, তার নিম্নরূপ মর্মার্থ আমাদের সংক্ষেপে বোঝালেন: এখন এখানে বাইরের কারোর থাকার অনুমতি নেই।   তবে ভবিষ্যতে হোটেল বা হোস্টেল জাতীয় কিছু তৈরী হতে পারে। তখন লোকে রাত্রি যাপন করতে পারবে।



প্রাচীন প্রাসাদ পেরিয়ে, কিছুদূর যাবার পরে, বুঝলাম এদিকটার চূড়ায় এসে পৌঁছেছি। আর উপরে ওঠা যাবে না। এবার নিচের দিকে নেমে সমুদ্রের উল্টোদিকে পৌঁছাতে হবে। নিচে নাম শুরু হল।  শুরুতে দেখলাম নিচে নামার পথটি বেশ অপ্রশস্ত ও খাড়া। এবার  আমরা তিনো  আর তিনেত্তো দ্বীপদুটো দেখতে পেলাম। মহিলা অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন: ওখানে একমাত্র সেনাবাহিনীর লোকজন থাকে। ওদের পরিবারের অনেক সময় ছুটি কাটাতে আসে।


 ওই দেখ দূরতর দ্বীপ: হয় তিনো নয়  তিনেত্তো



আমি সুদূরেরও পিয়াসী।

   রাস্তায় এক অভিনব ঘটনা ঘটলো। আকাশে বকের মতো কয়েকটা পাখি উড়ছিল। মাঝে মাঝে তারা নেমে মাটির উপরে বসছে। তাদের কাছাকাছি যেতে তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দিল পাখিগুলো। কিন্তু উড়ে পালাল না।  মহিলা বললেন: সাবধান। এরা ডিম পেড়েছে। যেকোনো সময় ঠুকরে দিতে পারে। আর তাহলেই রক্তারক্তি ব্যাপার হবে।

 ওরা তবু ডিম পারে।  

পাখিদেরকে পিছনে ফেলে রেখে, আবার নিচে নামতে লাগলাম, সমুদ্রতলকে লক্ষ্য করে। পথে একই জাতের, অন্য  এক পাখির, চার পাঁচটা ডিম চোখে পড়লো। ডিম ফেলে রেখে পাখি কোথায় উড়তে বেরিয়েছিল! পাখি ফিরে আসার আগে, সত্বর, কয়েকটা ছবি আর ভিডিও রেকর্ড করে নিলাম।

সমুদ্রতটে পৌঁছে মনটা আরও ভালো হয়ে গেলো। মানচিত্র খুলে দেখলাম সমুদ্রতটের এক বিন্দু থেকে আর এক  বিন্দুতে এসে পৌঁছেছি পাহাড় ডিঙিয়ে। জনা  বিশেক  লোক ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে।  অনেকেই অর্ধনগ্ন অবস্থায় শুয়ে শরীরে রোদ লাগাচ্ছে।  পিঠে বাচ্চা নিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে, দু একটা তরুণ বাপ-মা ও এসে পৌঁছেছে।


ওই দূরে আবছায়ায় তবু পাহাড় দেখা যায়।  


আমরা দ্বীপে নেমে, সমুদ্রের একেবারে ধারে, উঁচু মতো পাথরের ঢিবিতে বসে, যে স্যান্ডউইচ এনেছিলাম তাতে কামড় দিলাম। প্রথম গ্রাসটা গলাধঃকরণের পরে মাথাটা গরম হয়ে গেলো, এই প্রচন্ড খিদের মুখেও। স্যান্ডউইচে কিছুই নেই। একটা চিকেন ভেজে পাউরুটির মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এদেশে, কত সস্তায়, কত ভালো ভালো চিজ পাওয়া যায়। এক টুকরো স্যান্ডউইচে ঢুকিয়ে দিলে কি ভিখিরি হয়ে যেত? যাই হোক, গজগজ করতে করতে, খিদের মুখে ওটাই খেলাম। আমি দিব্যেন্দুকে পইপই করে বলেছিলাম। ও তো মাঝে মাঝে বেশি বোঝে! দেরি হয়ে গেছে, দেরি হয়ে গেছে বলে ঘর থেকে বেরোনোর সময়ই এত তাড়া লাগল যে রাস্তায় কিছু কিনতেই দিল না। তা না হলে এই অখাদ্য আমাদের খেতে হত  না। 

খাবার দাবার শেষ করে সমুদ্র সৈকতের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চক্কর লাগলাম। খুঁজে দেখার চেষ্টা করলাম— পাহাড় না ডিঙিয়ে, পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে, যে বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছাতে পারি কিনা! কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। দুদিক থেকেই সমুদ্র সৈকত খাড়া পাহাড়ে গোত্তা মেরে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। ফেরা শুরু করলাম, যে পথে এসেছি সে পথ ধরেই। মাঝখানে একবার ভাবলাম, যদি অন্য কোনো পথ দিয়ে ফেরা যায়। তারপর, কি ভেবে, সে পরিকল্পনা বাতিল করে, যে পথে এসেছি সেপথেই ফিরে এলাম। তফাৎ একটাই, ফেরাটা হলো দ্রুতগতিতে।

পোর্তো ভেনেরে ফিরে, বন্দরের কাছে একটু ঘোরাঘুরি করলাম। যে ক্যাথিড্রালটা পালমারিয়া দ্বীপ থেকে দেখেছিলাম, সেখানে একবার ঢুঁ মারলাম।  ক্যাথিড্রালের কাছেই আছে  চওড়া খাদের মতো একটা অংশ। বড় বড় পাথর সেখানে। এর বেশ কিছুটা পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়। অনেক মানুষই এখানে বসে রয়েছে। কবি বায়রন (Byron) এই জায়গাটি দেখে মুগ্ধ হয়ে একটা কবিতা লিখেছিলেন। সেকথা উল্লেখ রয়েছে একটা দেওয়ালে। এখানে কিছু সময় অতিবাহিত করে, ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলাম। বাস স্টপেজটা কাছেই— ফেরিঘাট থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটা পথ। টিকিটের মূল্য আড়াই ইউরো। মিনিট চল্লিশেক লাগলো লা স্পেৎজিয়া ফিরতে।



পোর্তো ভেনেরের গির্জা।  

বায়রন দাদুর কবিতা।  

দেখো ছোকরাদের কান্ড।

                               
                           সন্ধ্যা:পাব আর জিলাতো 
আজও ডিনার ঘরেই সারলাম। ডিনার শেষে মনস্থ করলাম যে একটা লোকাল পাবে যাবো। ভাবনা মতো কাজও হলো। বাড়ি থেকে দুশো মিটারের মধ্যে একটা পাবের সন্ধান পেলাম। ইন্টারনেটে এর রেটিংও ছিল খুব উচ্চমানের। খুব খারাপ না লাগলেও পাবের পরিবেশে মনটা ঠিক ভরলো না। ছোট খাটো, পঁচিশ ত্রিশ বর্গ মিটার, জায়গার মধ্যে অবস্থিত পাবটি। ঠাসাঠাসি করে লোকজন বসে আছে। প্রায় সকলেই স্থানীয়।   গল্প গুজব করছে। উচ্চস্বরে গানবাজনা হচ্ছে। এর বেশি কোনো বিশেষত্ব এই পাবের ছিল না। মিনিট চল্লিশ অতিক্রান্ত করে পাব থেকে বেরিয়ে এলাম।   




          রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে জিলাতোর জন্য আবার মন টানল। মনের দোষ কি! চারিদিকে এত জিলাতোর দোকান! বাইরের চাকচিক্য দেখে, হিসাব করে, একটা দোকানে গিয়ে ঢুকলাম। আমি নিলাম ব্ল্যাক চকোলেট আর আম,  দিব্যেন্দু  পেস্তা আর কফি   স্বাদের (Flavour)। এদের জিলাতো খেয়ে মনে হল এত ভাল জিলাতো আগে খাইনি।  সেই ফুচকার মত! সবাই ভাল বানায় কিন্তু ভোম্বলের মত ফুচকা দেখবে কোথাও পাওয়া যায় না।  কিংবা পাশের বাড়ির চম্পা কাকিমার মতো—  সব মা, কাকিমাই ভাল মাছের ঝাল রান্না করে, কিন্তু চম্পা কাকিমাদের হাতে একটা আলাদা জাদু থাকে। ঠিক তেমনি এই ক্যাথেরিনা  বৌদির দোকানের জিলাতো।  এমনটা সত্যি এর আগে বা পরে খাই নি। মহিলার নাম  ক্যাথেরিনা কিনা জানি না। আর কোন সম্পর্কে আমাদের বৌদি তা ও  জানি না।  বলার অপেক্ষা রাখে না এই নাম আর সম্পর্ক কার মস্তিস্ক প্রসূত!    
এখানকার জিলাতো ভালো লেগেছিল।


তৃতীয় দিন

                                          চলো Lets go রিওমাজ্ঞীওরে
পরের দিন লক্ষ্য ছিল রিওমাজ্ঞীওরে থেকে পোর্তো ভেনেরে হাইকিং করা। প্রথম দিন ট্রেন স্টেশনে যে পর্যটন তথ্যকেন্দ্রের কথা বলেছিলাম, তার কাছে গিয়ে দেখি বিরাট লাইন পড়েছে। তখন প্রায় সাড়ে ১১ টা বেজে গেছে। মাথায় হাত পড়লো। পর্যটন তথ্য  কেন্দ্রের ভিতরে পৌঁছাতে যে কত সময় লাগবে কে জানে! কিন্তু অন্য কোন উপায় ও নেই। তাই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। প্রায় আধঘন্টা বাদে, পর্যটন তথ্য  কেন্দ্রের ভিতরে, কাউন্টারের সামনে পৌঁছালাম। আগের দিনের মতো ই, চিঙ্কুয়ে ত্যারে কার্ড কিনলাম।  এরপর কাউন্টারের মহিলাকে, রিওমাজ্ঞীওরে থেকে পোর্তো ভেনেরে পদব্রজে যাবার বাসনা ব্যক্ত করলাম। চমকে উঠে বললেন  বলো কি? এ তো প্রায় ছয়-সাত ঘন্টার পথ। খুব বেশি লোক যায় না। দেখো কি করবে। তবে হ্যাঁ যাবার রাস্তা আছে। ভয়ংকর দুর্গম কিছু না। আবার ‘বাঁয়ে হাত কা খেল’ সেটাও ভেবো না। বাকিটা তোমাদের ইচ্ছা। 

আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বেরিয়ে এলাম। ঠিক করলাম যেমন পরিকল্পনা করেছি তেমনি হবে। তারপর দেখা যাবে।  রিওমাজ্ঞীওরে তে নেমে,   পোর্তো ভেনেরে যাবার পাহাড় পথ খুঁজতে, অনেক স্থানীয় লোকের সহায়তা নিতে হলো। প্রায় প্রত্যেকেরই অভিব্যক্তি ছিল একই রকম। বাবা! ওতো অনেক দূর! এরই মাঝে একটা লাভ হলো। এদিক সেদিক যেতে যেতে 'ভিয়া দেল আমোর’এ   (Via dell’Amore) এসে উপস্থিত হলাম। নিজেদের অজান্তেই। 'ভিয়া দেল আমোর’ এর অর্থ প্রেমের পথ। এটাই বিখ্যাত The Blue Path যাত্রামুখের শুরু। এখন তালা বন্ধ আছে। এখান থেকে সমুদ্রের একটা সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে। তাই দেখতে বহু লোক ভিড় করেছে।   


ভিয়া দেল আমোর   
  
তা সে যাই হোক, রিওমাজ্ঞীওরে থেকে পোর্তো ভেনেরে পদব্রজে যাবো শুনে লোকজনের যা প্রতিক্রিয়া হল, তাতে এবার নিজেদের মনেই একটা সংশয় ভাব তৈরী হল। প্রথমে পর্যটন কেন্দ্রের ওই মহিলা, তারপর এতগুলো রাস্তার স্থানীয় লোক, আর সর্বশেষ একটা পুলিশের লোক — এতো লোকে সবাই কি ভুল বলবে? কথায় বলে, দশচক্রে ভগবান ভূত। মনস্থ করলাম: যাত্রা শুরু তো করি। তারপর না হয় দেখা যাবে।
 ধীরে ধীরে রাস্তা উপরের দিকে উঠতে লাগলো। তখনও পাহাড় বা জঙ্গল পথ শুরু হয় নি। দুদিকে ঘরবাড়ি। ঘর বাড়িগুলো সব রংবেরঙের। ভিড়ে গিজগিজ করছে গোটা শহর। দেশ বিদেশের লোক। এখনই এত লোক! গরমের ছুটি ঝখন পড়বে তখন এসব জায়গার কি হাল হয় কল্পনা করলাম। ইস্টারের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। খাবারের দোকান, পানের দোকান, জিলাতোর দোকান, মাছভাজার দোকান—   সব ভিড়ে ভিড়াকার। আর একটা পর্যটন তথ্যকেন্দ্র চোখে পড়লো। সঠিক অভিমুখে গমন করছি কিনা সেটা আর একবার নিশ্চিৎ হয়ে নিলাম। পর্যটন তথ্য  কেন্দ্র ছাড়িয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে পাহাড়ের রাস্তা শুরু হলো।

      রিওমাজ্ঞীওরে থেকে পোর্তো ভেনেরে: আবার হাইকিং, প্রায় ছয় ঘন্টা   
এখনও অবধি কোথাও পোর্তো ভেনেরের নামগন্ধ চোখে পড়লো না। খুব বেশি লোকজনও চোখে পড়লো না। দু একজন যাদেরই দেখা পেলাম তাদের জিজ্ঞসা করে নিশ্চিৎ হয়ে নিলাম যে ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কি না। এমনিতেই দেরি করে শুরু করেছি। দীর্ঘ পথ বাকি।  তার মধ্যে দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়লে কপালে দুর্ভোগ আছে। তাই লজ্জা না করে বারবার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম।  প্রায় সকলেরই মুখে এক রায়। দূর! বহু দূর। আধঘন্টা মতো হাঁটার পরে, রিওমাজ্ঞীওরে শহরটাকে পাহাড়ের ঢাল থেকে থেকে দেখা গেল।


পাহাড়ের মাথা থেকে রিওমাজ্ঞীওরে

আরও আধঘন্টা হাঁটার পরে, পাহাড়ের মাথায়, একটা মঠ (monastery cum sanctuary) দেখতে পেলাম। এখানে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে। ছেলে ছোকরার দলই বেশি। কর্মঠ মধ্যবয়সীরাও রয়েছে। বসে গল্প গুজব করছে। পিকনিক করছে। দু চার জনের সাথে কথা বার্তা বলে বুঝলাম, শুধুমাত্র এই মঠের দর্শনের জন্যই অনেকে এসেছে। দর্শনযোগ্যই বটে। একে পাহাড়ের মাথায়, তারপরে আর এক দিকে খাড়া পাহাড় সমুদ্রে মিশেছে।  পাহাড়ের মাথাটি শঙ্কুর মত ছুঁচালো না, বরং সমুদ্রের সমান্তরালে বিস্তৃত হয়েছে। গাছপালা, বনস্পতির ছায়া, রংবেরংয়ের পুষ্পসজ্জা— নয়ননন্দিত হচ্ছে চারিদিক।  ইচ্ছা হলো ঘন্টা খানেক এখানেই বসে কাটিয়ে দিই।   
ফুলে ফুলে ফুলে আছে চারিদিক।


কিন্তু আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। তাই আরামের কোনো প্রশ্নই নেই । সামনের দিকে এগোলাম। এক প্রৌঢ়  দম্পতি র সাথে আলাপ হল।  স্থানীয়। পোর্তো ভেনেরের  র রাস্তা জিজ্ঞাসা করলাম। বললো: ঠিকই যাচ্ছ।  সামনে এগিয়ে যাও।  প্রথমে তেলিগ্রাফো (Telegrafo) বলে একটি জায়গা আসবে। তারপরে চ্যাম্পিগ্লিয়া  Campiglia। সেটা পেরিয়ে তোমাদের গন্তব্য। ওনাদের নির্দেশিত পথে যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষনের মধ্যে এই প্রথম তেলিগ্রাফোর দিক নির্দেশনা চোখে পড়লো। সরু, এবড়ো খেবড়ো, জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চললাম। পাহাড়ের মাথায়।  কখনও একটু উঁচুতে, কখনও একটু নিচুতে। ডানদিকে, নানা রকমের, ছোট বড়ো গাছগাছালি আর কয়েক হাতের মধ্যে সমুদ্র। বাঁদিকে প্রসারিত পাহাড়। ঘন্টাখানেক চলার পরে তেলিগ্রাফোতে এসে পৌঁছালাম। বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়েছে এখানে। অনেক হাইকারের দল এসে জুটেছে। এখানে পাহাড়ের মাথা সড়ক পথে সমতলের সাথে যুক্ত। একটা রেস্তোরাঁ আছে।  বেশ কিছু লোক গাড়ি নিয়ে এসেছে। আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল চ্যাম্পিগ্লিয়া র দিকে এগোলাম, এখানে বিশেষ সময় নষ্ট না করে।


কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা। 

এখান থেকে চ্যাম্পিগ্লিয়া  ঘন্টা দেড়েকের পথ। উঁচু নিচু পথে, গাছ গাছালি ভেদ করে, এগিয়ে যেতে লাগলাম। এই যাত্রাপথ খুব কষ্টকর বা কঠিন ছিল না। মাঝে মধ্যেই উল্টোদিক থেকে আসা হাইকারদের চোখে পড়লো। বেশিরভাগই ইউরোপের লোক। শহরে যেমন গোটা বিশ্বের লোকজন দেখেছিলাম, এখানে সে সব চোখে পড়ল না।  চ্যাম্পিগ্লিয়াতে পৌঁছে মন উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। কিছু দোকানপাঠ, জনবসতি চোখে পড়লো। যা এই দীর্ঘ পাহাড় পথে চোখে পড়েনি। এতক্ষণ পাহাড়ে জঙ্গলে হেঁটে সেটাই স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠেছিল। শহর দেখে মনে হল বাহ্ বেশ নতুন জিনিস তো! মানুষের মন, মাঝে মধ্যে, কত তাড়াতাড়ি নতুনের সাথে মানিয়ে নেয়, এক হয়ে যায়, ভাবলেই অবাক লাগে।



কাছেই একটা দোকান ছিল— পাব আর রেস্তোরাঁ একসাথে। সেখানে ঢুকে একটা কোক আর একটা বিয়ারের ক্যান নিয়ে ফিরলাম। এর সাথে, বাড়ি থেকে আনা স্যান্ডউইচ সহযোগে, তীব্র জঠোর জ্বালা নিবারণ করলাম, একটি পাবলিক পার্কের বেঞ্চে বসে। অবর্ণনীয় দৃশ্য— সামনে অনন্ত সমুদ্র আর পাহাড়ের গায়ে, খাদে, ছোটো ছোটো বাড়িগুলো। এখানে লোকজন খুব সহজ, সরল ও সুখী জীবন যাপন করে— কেন জানি না মনে হলো। মিনিট পনের খাওয়া দাওয়ায় অতিবাহিত করে,যাত্রাপথের শেষ অংশের, চ্যাম্পিগ্লিয়া থেকে পোর্তো ভেনেরের , উদ্দেশে চলা শুরু করলাম।



 কিছুদূর যাওয়ার পরে, উল্টোদিক থেকে আসা এক হাইকার দম্পতির সাথে আলাপ হল। ওরা বলল পোর্তো ভেনেরে যাবার দুটি পথ আছে। একটি একটু দীর্ঘ কিন্তু সহজ আর একটি নাতিদীর্ঘ কিন্তু কঠিন।  আমরা জেনে বুঝে কঠিন রাস্তাটাই নির্বাচন করলাম। যার প্রথম কারণ আর বেশি হাঁটতে ইচ্ছা করছিল না,  তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাইছিলাম। আর দ্বিতীয় কারণ এডভেঞ্চার।   


ডাইনে খাড়া সমুদ্র। পা হড়কালেই নির্ঘাৎ মৃত্যু। 


কি রে? তোরা সাঁতার জানিস? 

প্রথম দশ মিনিট, রাস্তার কাঠিন্য কিছু অনুভূত হলো না। তারপরে ক্রমশঃ এর মহিমা টের পেতে শুরু করলাম। ভয়ঙ্কর সরু রাস্তা। বাঁয়ে পাহাড়ের দেওয়াল আর ডাইনে খাড়া সমুদ্র। যার অর্থ, পা হড়কে পড়লেই নির্ঘাৎ মৃত্যু। এমন ভাবেই এই রাস্তা চলতে লাগলো ঘন্টা খানেক। মাঝে মধ্যে রয়েছে বড়সড় বাঁক।  সব মিলে, যাত্রাপথের এই অংশটুকুতে শারীরিক দক্ষতার থেকে মানসিক দক্ষতা বড়  হয়ে দেখা দিলো। দু একবার ঈশ্বর কৃপায় নিস্তার পেলাম।  ইষ্ট নাম জপতে জপতে কখন দেখি শহরে ঢুকে গেছি। পাকা রাস্তা দেখা যাচ্ছে। এবার উঁচু থেকে কেবলমাত্র সমুদ্রতলে নামা।  অজস্র সিঁড়ি ভেঙে, পাহাড় বিজয়ের এক অনন্ত আনন্দ নিয়ে, সমুদ্রতলে যখন পৌছালাম, তখন দেখি এটা তো সেই গতকালকের পরিচিত জায়গা, পোর্তো ভেনেরে  ক্যাথেড্রালের বেশ কাছেই।  

                                  
                                     এ শুধু খাবার দিন  
গত কালকের মতোই  বাসে  ফিরলাম।  খিদে পেয়েছিল।  আজ আর ঘরে ডিনার না!  স্নান সেরে, ঝিনচ্যাক একটা পোশাক পরে, বাইরে বেরিয়ে এলাম। প্রথমে হানা দিলাম  রিওমাজ্ঞীওরের সেই  মাছের দোকানটিতে। আমরা খাবার পছন্দ  করলাম।  দুজনার হাতে দুটো ঠোঙা ধরিয়ে দিল। আমার ঠোঙায় ছিল মাছ আর আলুভাজা র সমন্বয়—  তথাকথিত "ফিশ এন্ড চিপস"। দিব্যেন্দুর ঠোঙায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ আর পোকামাকড়। সমুদ্রের ধার বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে,  ভেলপুরি আর বাদাম ভাজার মত,  এসব খেতে খেতে মনের গভীরে এক অনবগত পুলকবন্যা বয়ে গেল। এমন অনুভব আগে কখনো হয় নি। ছাঁকা তেলে ভাজা সামুদ্রিক মাছের কি অপূর্ব স্বাদ হতে পারে তা যে না খেয়েছে তার পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব!




এ শুধু খাবার দিন


এ শুধু পানের দিন।   

ঘন্টাখানেক পরে লা স্পেৎজিয়া ফিরে এলাম। এতক্ষন তো সবে স্টার্টার হয়েছে! আজ খাবার মুডে ছিলাম। এবার আসল যাত্রাপালা শুরু হবে। দেখে শুনে একটা জমজমাট রেস্তোরাঁয় বসলাম। দুরকম খাবার অর্ডার দিলাম— একটা পাস্তা আর একটা স্পাগত্তি। আর সাথে একটা হোয়াইট ওয়াইন। খাবার দাবারের স্বাদ বেশ লাগলো। অনেকক্ষণ ধরে বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে লাগলাম। আমাদের মতো অনেকেই সময় নিয়ে গল্প করতে করতে খাওয়া দাওয়া করছিলো। সবাই যেন ছুটির মেজাজে আছে। কোন চিন্তা নেই।  চাপ নেই।  ইতালির অতি পরিচিত রূপ।

চতুর্থ দিন: ফ্লোরেন্স যাত্রা
পরের দিন আমার শরীর একটু বেগরবাই শুরু করল। বুঝলাম, খিদের মুখে, খালি পেটে দুম করে ছাঁকা তেলে ভাজা সামুদ্রিক মাছ খাওয়াটা ঠিক হয়নি।  ভাগ্যক্রমে, আমাদের হাইকিং পর্ব শেষ হয়েছিল। এদিন ফ্লোরেন্স শহরটা ঘুরলাম। চমকে দেওয়া এক একটা অট্টালিকা। মূর্তি। ভাস্কর্য আর স্থাপত্য যেন রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।  এ লেখায় খুব বেশি কিছু এ নিয়ে লিখব না। শুধু পেটের গোলমালের কারণে, আমাদের খাদ্যাভিযান বন্ধ রাখতে হল।  ফলমূল, হালকা ফুলকা জিনিস খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। 


ফ্লোরেন্স। 


     ফেরার দিন: পিসার বাঁকা মিনার    
পরের দিন  ঘরে ফেরার কথা।  পরিকল্পনা মত, কাক ভোরে  উঠে, ব্যাগ পত্র গুছিয়ে, প্রথমে ঘর ছেড়ে দিলাম।  চাবি ফেরৎ দিলাম মহিলাকে।  ট্রেন ধরলাম। প্রথমে পিসায় নামলাম।  এদের বিখ্যাত হেলানো মিনার (Tower) টা দেখতে হবে। স্টেশনে ক্লক রুম আছে।  সেখানে ব্যাগ রেখে দিলাম। সকাল তখন সাতটা বাজে। স্টেশন ফাঁকা। গুগল মানচিত্র দেখে হেলানো মিনার এর দিকে পা বাড়ালাম।  শহর ঘুমন্ত।  রাস্তা ঘাট সব ফাঁকা।  হাতে গোনা কিছু গাড়ি ঘোড়া চলেছে। হেলানো মিনার এর যত কাছে আসতে লাগলাম, লোকের ভিড় ও বাড়তে লাগল। অবশেষে মিনার চোখে পড়ল। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দেখলাম বিরাট লাইন পড়েছে। আমাদের হাতে যা সময় আছে তাতে এত লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে, টিকিট কেটে, মিনার এর উপরে ওঠা সম্ভব নয়। কাউন্টার এখনো খুলেছে কি না কে জানে।  হাতে সময় আমাদের খুব কম। মনটা খারাপ হয়ে গেল।  ভাবলাম, আগের দিন এলেই ভাল হত। 


মিনারটাকে একটু বেঁকিয়ে ফেলেছে ভুল করে। 



আঙ্গুর ফল চিরকালই টক হয়। দিব্যেন্দু বলে উঠল "ধূর ! একটা সামান্য মিনার এরা সোজা করে বানাতে পারে না, শুধু মুখে বড় বড় কথা! বাইরে থেকে দেখলেই যথেষ্ট।" যাই হোক, দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে রোমে ফিরলাম। সন্ধ্যাবেলা হেলসিংকির বিমান। এত উষ্ণতা, এত ভালোলাগা ছেড়ে আবার চিরশীতলের দেশে ফেরা। শুধু একটাই সান্ত্বনা, এপ্রিল পেরিয়ে সময় ক্রমশ মে মাসের দিকে এগোচ্ছে। ফিনল্যান্ডে, দীর্ঘ অন্ধকারময় শীতের অবসান ঘটবে ক্রমশ। দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। মৃতপ্রায় সব গাছ তাদের কঙ্কালসার, পেতমূর্তি থেকে বেরিয়ে এসে সবুজে সবুজ হবে।  নীলাকাশ ভরে উঠবে উড্ডীয়মান পাখির কলরবে। নীলচে সবুজ  সমুদ্রের বুক দিয়ে ডিঙি নৌকাগুলো পারি দেবে ছোট ছোট দ্বীপ গুলোতে।  মধ্যরাত্রির সূর্যে স্নাত হয়ে, সাদা বকের মত নাম না জানা পাখিগুলো, বসবে  সবুজ ঘাসের উপর। বাঙালি গীতিকারের  লেখা সেই কবেকার গান চুরি করে সবাই গেয়ে উঠবে —
আয়রে ছুটে, আয়রে ত্বরা
হেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জরা,
হেথা বাতাস গীতি-গন্ধভরা
চির- স্নিগ্ধ মধুমাসে
হেথা চির-শ্যামল বসুন্ধরা
চির- জ্যোৎস্না নীল আকাশে।

  



  

     

Comments

  1. Bah! Khub bhalo laglo. Typical bhrmaner barnana nay. oi samayer mood ta o khub bhalo captured hayechhe lekha ebong photo te.

    ReplyDelete

Post a Comment